মতামত

রেজাল্টই জীবনের শেষ কথা নয়, দক্ষতাই গড়বে ভবিষ্যৎ

প্রকৌশলী মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম >>

আজ যাদের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়েছে, তাদের সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।

---------

যারা ভালো ফলাফল করেছ, তোমাদের অভিনন্দন! তবে মনে রাখতে হবে, এটি একটি দীর্ঘ যাত্রার কেবল সূচনা, শেষ নয়। অন্যদিকে, যাদের ফলাফল প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি বা কিছুটা খারাপ হয়েছে—তোমাদের উদ্দেশে বলছি, ভেঙে পড়ার বা হতাশ হওয়ার বিন্দুমাত্র কারণ নেই। জীবন অনেক বড়। এখানে হতাশ হয়ে পিছু হটার কিছু নেই। একটি পরীক্ষার ফলাফল কখনোই কোনো শিক্ষার্থীর মেধা, যোগ্যতা ও ভবিষ্যতের চূড়ান্ত বিচারক হতে পারে না।

দীর্ঘ পেশাগত ক্যারিয়ারে একটি বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে—‘ভালো ছাত্র মানেই ভালো রেজাল্ট, আর ভালো রেজাল্ট মানেই সফল ক্যারিয়ার’—বাস্তব কর্মক্ষেত্রে এই সূত্রের অমিলই বেশি চোখে পড়ে। জিপিএ-৫ না পেয়েও কিংবা আশানুরূপ ফল না করেও অনেকে নিজের দক্ষতা, মেধা, সততা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সমাজে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন। এমন উদাহরণ আমাদের চারপাশেই অসংখ্য।

তাই ফলাফল যেমনই হোক না কেন—রেজাল্ট নিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া কিংবা হতাশায় নিমজ্জিত না হয়ে বাস্তবমুখী শিক্ষায় মনোযোগ দেওয়াই এখন বুদ্ধিমানের কাজ। প্রাতিষ্ঠানিক জিপিএ বা সিজিপিএর পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে নতুন কিছু শেখা এবং সেই জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার উপযোগী করে নিজেকে গড়ে তোলার এটাই উপযুক্ত সময়।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও ইনফোগ্রাফিকের দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যায়, কীভাবে বিগত বছরগুলোতে কেবল ‘পাশের হার’ ও ‘জিপিএ-৫’-এর কৃত্রিম জোয়ার তৈরি করে শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত মানকে আড়াল করা হয়েছিল। এর চরম পরিণতি আজ আমরা বিভিন্ন পেশাগত খাতে দেখতে পাচ্ছি। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একজন ডিগ্রিধারী গ্র্যাজুয়েট তাঁর নিজস্ব বিষয়ের ন্যূনতম মৌলিক জ্ঞানটুকুও ধারণ করেন না, অথচ তাঁর একাডেমিক সার্টিফিকেটে শোভা পাচ্ছে জিপিএ-৫ কিংবা উচ্চ সিজিপিএ!

আমরা প্রত্যাশা করি, বর্তমান সরকার ও নীতিনির্ধারকেরা তথাকথিত ‘জিপিএ-নির্ভর’ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে একটি বাস্তবমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। শিক্ষা যেন কেবল কাগজসর্বস্ব সার্টিফিকেট অর্জনের হাতিয়ার না হয়ে মেধা, মনন ও মৌলিক দক্ষতা বিকাশের কার্যকর মাধ্যম হয়।

একটি গতিশীল ও বাস্তবমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গঠনে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা জরুরি—

১. দক্ষতাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন:

কেবল মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার ওপর চূড়ান্ত মূল্যায়ন না করে শিক্ষার্থীদের সারা বছরের ক্লাসরুম পারফরম্যান্স, প্র্যাকটিক্যাল প্রজেক্ট এবং সমস্যা সমাধানের (Problem-solving) দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া।

২. কারিগরি শিক্ষার প্রসার ও অন্তর্ভুক্তি:

মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি, প্রোগ্রামিং, ইলেকট্রনিক্স ও আধুনিক ব্যবহারিক কারিগরি বিষয়গুলোকে মূল কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত করা।

৩. শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংযোগ (Industry-Academia Collaboration):

কেবল তাত্ত্বিক পড়ালেখায় সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীদের সরাসরি শিল্পকারখানা ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে ইন্টার্নশিপ বা কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা।

৪. শিক্ষকদের মানোন্নয়ন ও স্বচ্ছতা:

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষকদের নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকতায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা।

৫. উদ্যোক্তা মানসিকতার বিকাশ:

তরুণ প্রজন্মকে কেবল প্রচলিত চাকরিপ্রার্থী না বানিয়ে সৃজনশীল চিন্তক ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মতো পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা।

আসুন, জিপিএ-৫-এর মোহ থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের দক্ষ, সৎ ও যোগ্য মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলি। কারণ দিনশেষে কাগজের রেজাল্ট নয়, আপনার বাস্তবমুখী ও কার্যকর দক্ষতাই আপনাকে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকিয়ে রাখবে।