নুরুল মুহাম্মদ কাদের
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতিদিন নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষ আসেন। সম্প্রতি এক দম্পতি এসে জানালেন, তাদের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তান মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে। বাবা একজন ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। মাদকের টাকা না দেওয়ায় সে বাবা-মাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে তারা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সমাজে এমন ঘটনা এখন অহরহ ঘটছে।
একসময় শহর ও গ্রামে গোপনে মাদক সেবন করা হতো, এখন তা অনেক ক্ষেত্রে প্রকাশ্যেই হচ্ছে। মাদক গ্রহণের পর আসক্তরা অলিগলিতে দলবেঁধে আড্ডা দেয়, সুযোগ পেলেই টাকা জোগাড় করতে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে তারা যৌন সহিংসতা বা ধর্ষণচেষ্টার মতো ভয়াবহ অপরাধও সংঘটিত করে। এমনকি দিনের আলোতেও নগরীর কিছু এলাকায় চলাচল করতে সাধারণ মানুষ ভীত বোধ করেন। পথচারীরা নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক সময় এসব এড়িয়ে যান, ফলে ভুক্তভোগীরা অসহায় হয়ে পড়েন।
সম্প্রতি পতেঙ্গা ও রাঙ্গুনিয়ায় মাদকবিরোধী মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিঃসন্দেহে সমাজের জন্য এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ খুব কমই আছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সচেতন জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এখনও নির্লিপ্ত। অনেকেই মনে করেন, মাদক নির্মূল করা শুধু সরকারের দায়িত্ব। অথচ বাস্তবতা হলো, সরকারের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিককেও এ যুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ ও জনসম্পৃক্ততা।
ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে নেশাজাতীয় দ্রব্যকে বলা হয় “উম্মুল খাবাইস” বা সব পাপের জননী। কারণ, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মানুষের বিবেক ও নৈতিক বোধ লোপ পায়। তখন সে ব্যভিচার, চুরি, পারিবারিক ভাঙন, শত্রুতা ও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। বুজুর্গ ও বিজ্ঞজনেরা একটি রূপক ঘটনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। বলা হয়, এক ব্যক্তিকে তিনটি অপরাধের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হয়েছিল—শিশুহত্যা, ব্যভিচার অথবা মদপান। সে মদপানকে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর ভেবে তা বেছে নেয়। কিন্তু নেশাগ্রস্ত হওয়ার পর বিবেক হারিয়ে শেষ পর্যন্ত অন্য দুটি জঘন্য অপরাধও করে বসে। এ ঘটনাই প্রমাণ করে, মাদক কতটা ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। মাদক নামক এই সর্বনাশা ব্যাধি থেকে সমাজকে রক্ষা করতে কয়েকটি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি—
পাড়া-মহল্লা, মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাদকবিরোধী সামাজিক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় সমাবেশে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো যেতে পারে।
মাদকসেবী ও মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও ইতিবাচক বিনোদনের মাধ্যমে যুবসমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে হবে।
স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি ওয়াচ গ্রুপ গঠন করে মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়াতে হবে।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। মাদকসংক্রান্ত মামলায় আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করে দ্রুত বিচার ও কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। তাই মাদকের আগ্রাসন প্রতিহত করা এখন সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্বগুলোর একটি। সচেতন নাগরিকরা যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ান, তবে একটি মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা অবশ্যই সম্ভব।
মনে রাখতে হবে, আজ আমরা যদি নির্লিপ্ত থাকি, কাল হয়তো আমাদের নিজের পরিবারই এই আগ্রাসনের শিকার হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সংগঠক।


















































