দেবব্রত সেন »
গনগনে তপ্ত প্রহরে ছাপাখানার ভেতরের ব্যস্ততা যেন এক মহাকাব্য। বাইরে যখন রোদচশমা চোখে ক্লান্তি ছড়ায়, তখন ভেতরের অন্ধকারে চলছে অবিরাম রূপান্তরের চাকা । ছাপাখানার ঘুলঘুলি দিয়ে তীব্র আলো ভেতরের জমাট বাঁধা অন্ধকারে তীরের মতো এসে বিঁধছে। সেই আলোর রেখায় দেখা যায় কোটি কোটি ধূলিকণা আর ওয়ান-টাইম কালির সূক্ষ্ম বাষ্প বাতাসে ভাসছে। কালির সেই ঝাঁঝালো গন্ধ দুপুরের গরমে আরও তীব্র, আরও কড়া লাগছে। সীসা আর অ্যাসিডের গন্ধ মিলে বাতাসকে এক অদ্ভুত মাদকতায় ভরিয়ে তুলেছে । ভেতরের লোহার দানবগুলো যেন আরও বেশি খ্যাপাটে হয়ে গেছে । ঝপঝপা ঝপ খটর খটর খট শব্দের সাথে রোলারগুলোর ঘূর্ণনের শব্দ একাকার হয়ে আদিম সুরের মূর্ছনা তখন তুঙ্গে ।
পত্রিকা অফিস থেকে বের হয়ে মনির এসেছে তার কাজের অগ্রগতি তত্বাবধানে । এই সময়েই প্রথম ফোন কলটা এসেছিল কিন্তু প্রেসের শব্দে টের পায়নি। প্রেস থেকে বেরিয়ে যাবে এমন সময় আবার এল কলটা। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মিনহাজ ভাইয়ের শান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
মনির কি ব্যস্ত আছো?
জ্বী না ভাইয়া। প্রেসে আসছিলাম, বলেন না, সমইস্যা নাই ।
এখন তোমার হাতে কোনও কাজ আছে? দুপুরের খাবার খেয়েছো?
না ভাইয়া এখনও খাইনি, ব্যস্ত ছিলাম এতক্ষণ।
কোথায় খাও দুপুরে?
ঠিক নাই ভাইয়া। কোনও দিন বাসায় আবার কোনও দিন নিচের হোটেল থেকে করলা ভাজি দিয়ে ভাত একপ্লেট খেয়ে ফেলি।
তাহলে চলে আস আমার অফিসে, আমরা একসাথে খাই আজ।
মনির কীভাবে কী বলবে হঠাৎ বুঝতে না পেরে চুপ করে গেল । এটা বুঝতে পেরে মিনহাজ ভাই বললেন,
আরে এত ইতস্তত করছো কেন? আমি আজ একটু ফ্রি আছি, ভাবলাম তোমার পত্রিকা এবং লেখালেখির গল্প শুনবো । চলে এসো ।
আইচ্ছা ভাইয়া, বলে মনির ফোনটা রেখে দিলো ।
সীমান্তের কাছাকাছি অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা গ্রাম থেকে আলো হাতে আসা মনির সুপান্থ জেলাশহর আলোকিত করে সৃষ্টিশীল কাজের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে এগিয়ে যাওয়া আবেগী এক তরুণ । ছোট কাগজ সম্পাদনার মাধ্যমে প্রথাগত বাণিজ্যিক ধারার বাইরে গিয়ে তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল কবি-লেখকদের সৃষ্টিশীল কাজ প্রকাশ করা তার মূল লক্ষ্য। নিজে গল্প লেখে আর গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, এবং সমকালীন সাহিত্য সমালোচনার মাধ্যমে মূলধারার সাহিত্যের পাশাপাশি একটি চিন্তাশীল বিকল্প ধারা তৈরি করার প্রয়াশে নিয়মিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে । বিশেষ বিশেষ থিম বা সাহিত্য সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে প্রকাশ করে সাহিত্য পত্রিকা। কয়েক বছর ধরে নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থার মাধ্যমে মানসম্মত সৃজনশীল বই প্রকাশের কাজও করে যাচ্ছে। কেবল পত্রিকা সম্পাদনা এবং প্রকাশনার কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি সে, গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে বই পড়ার অভ্যাস ছড়িয়ে দিতে সে গ্রামে একটি পাঠাগারও প্রতিষ্ঠা করেছে ইতোমধ্যেই। তরুণেরা যাতে প্রযুক্তির অপব্যবহার বা বিপথগামিতা থেকে দূরে থেকে সুস্থ ও মননশীল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, সেই লক্ষ্যে এই পাঠাগারটি বিনামূল্যে বই পড়ার সুযোগ করে দেয়। মনির মনে করে, শিল্প-সংস্কৃতির নানা মাধ্যমে কাজ করে সমাজকে সঠিক পথ দেখানো এবং সব ধরনের অপচেষ্টাকে রুখে দিয়ে আলোকিত সমাজ দেখার প্রত্যাশায় নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়াটাই তার কর্তব্য । এ লক্ষ্যে সে দেশবরেণ্য গুণীজন, কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, শিক্ষক এবং সাংবাদিকদের নিয়ে নিয়মিত পাঠচক্র ও আড্ডার আয়োজন করে যাতে সবাই মননশীল চিন্তার খোরাক আদান-প্রদান করতে পারেন। এইসব আড্ডায় সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ, নাটক এবং চলচ্চিত্রসহ দেশ-বিদেশের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মুক্ত আলোচনা ও যুক্তি-তর্ক হয়। তার এসব কর্মকাণ্ডে মুগ্ধ হয়ে একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক তাকে ঐ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী পাতা সম্পাদনার দায়িত্বও অর্পণ করেন ।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা রিপন মিনহাজের সাথে মনিরের পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়। রিপন মিনহাজ নিজে কবিতা লেখেন, কিছু বই আছে তার । এখানে বদলি হয়ে আসার পর থেকে স্থানীয় সাহিত্যিকদের সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দুই একবার দেখা হলেও তেমন ঘনিষ্ঠতা হয়নি যে মনিরকে মধ্যাহ্ন আহারের দাওয়াত দিয়ে বসবেন সরাসরি । মনির আবেগপ্রবণ মানুষ কিন্তু খুব বেশি খুশিও হতে পারছে না । তাছাড়া এত বড় অফিসের এত বড় কর্মকর্তার সাথে ওঠাবসার মতো সুযোগ এবং অভ্যাস কোনওটাই তার নেই । রিপন মিনহাজ যে গাড়িতে আসা যাওয়া করেন তা মনির দেখেছে, তাছাড়া সবাই তাঁকে যেভাবে স্যার সম্বোধন করে কথা বলে মনির তা পারে না । একরকম হতবিহ্বল অবস্থায় মনির রওনা হলো।
এই অফিসে মনির আগে কখনও আসেনি, আসার প্রয়োজনও হয়নি তার । অফিসের প্রবেশপথ এবং চারপাশের উন্মুক্ত স্থানে নান্দনিক বাগান, দেশি-বিদেশি ফুল, পাতাযুক্ত গাছ এবং নিখুঁতভাবে ছাঁটা ঘাসের লন দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলো। একপাশে কর্মকর্তা ও দর্শনার্থীদের যানবাহনের জন্য প্রশস্ত পার্কিং, মেঝে পেভার ব্লক দ্বারা নির্মিত। বেশ কয়েকটি গাড়ির সাথে রিপন মিনহাজ ভাইয়ের বড় জিপটিও শোভা পাচ্ছে । ধুলোবালিমুক্ত ঝকঝকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নান্দনিক বাগান এবং ভবনের মাঝ দিয়ে হাঁটার জায়গা পার হতেই কিছু লোকজন চোখে পড়ল, বাগানের পাশে পাথরের বেঞ্চে বসে গল্প করছে । কোনদিকে যাবে এটা ভাবতে ভাবতেই যখন এগুচ্ছে তখন একজন ইউনিফর্ম পরা কর্মী এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,
কোথায় যাবেন স্যার? কার কাছে?
স্যার সম্বোধন শুনে মনির একটু আড়ষ্ট হলো ভেতরে ভেতরে। কিন্তু ঐ ভদ্রলোককে তা বুঝতে দিলো না। বললো, আমি মিনহাজ ভাইয়ের সাথে দেখা করতে এসেছি ।
স্যারের সাথে কি আপনার অ্যাপয়েন্টম্যান্ট করা আছে?
হ্যাঁ, তিনি নিজেই আমাকে আসতে অনুরোধ করেছেন ।
লোকটা সপ্রতিভ হয়ে বললো, আসুন আমার সাথে ।
লোকটার পেছন পেছন এগিয়ে যেতে লাগলো মনির । বড় বড় জানালা বিশিষ্ট এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুসজ্জিত কক্ষগুলোর দৃশ্যমান স্থানে নাগরিক সনদের তালিকা টাঙানো আছে, যেখানে সেবাপ্রত্যাশীরা তাদের কাজ ও খরচের নিয়মাবলি দেখতে পান। বিভিন্ন চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের অগ্রগতির তালিকা দেওয়ালে এবং বোর্ডে হালনাগাদ করা, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের নিয়ে নিয়মিত বৈঠকের বড় কনফারেন্স রুম পেরিয়ে মিনহাজ ভাইয়ের ব্যক্তিগত সহকারীর রুমে এলো লোকটি । মনিরকে ওখানে বসতে বলে, সহকারীর সাথে কথা বলে লোকটা চলে গেল ।
সুন্দর ঝকঝকে কক্ষের দেয়ালগুলোতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের নকশা, রোড ম্যাপ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের বিশদ চিত্র শোভা পাচ্ছে । কাঠের বড় টেবিল, সারি সারি আলমারি। টেবিলে প্রতিনিয়ত কাজের নথিপত্র , বিল, প্রাক্কলন বা এস্টিমেট, টেন্ডার সংক্রান্ত ফাইল, কম্পিউটার। সহকারী মহোদয় মনিরকে বসিয়ে রেখে বের হয়ে গেলো, একটু পরেই আবার ফিরে এসে তাকে অনুসরণ করার ইঙ্গিত দিলো। মনির সাধারণ মানুষ, এসবের মধ্যে তার নিজেকে একটু বেমানান লাগছে ।
দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকে হতভম্ব হয়ে গেল মনির। সরকারি অফিসে এমন আভিজাত্য আগে কখনও দেখেনি মনির। সালাম দিতেই মিনাহাজ ভাই সালামের জবাব দিয়ে বসার ইঙ্গিত করেন । বিশাল সোফাসেটের এক কোণায় জড়সড় হয়ে মনির বসলো।
সেগুন কাঠের বড় আকৃতির সেন্টার টেবিলের ওপাশে ধবধবে সাদা টাওয়েল জড়ানো রিভলবিং চেয়ারে বসে জরুরি একটা ফাইল দেখছেন তিনি। টেবিলের ওপর একটি ল্যাপটপ, পাশে আরেকটি ছোট টেবিলে ডেস্কটপ কম্পিউটার, ফাইল হোল্ডার, কলমদানি এবং কিছু কাগজের ওয়েটবোর্ড।
চেম্বারের সবচেয়ে বড় দেওয়ালে জেলার বড় একটি ডিজিটাল রোড নেটওয়ার্ক ম্যাপ টাঙানো, একটি প্রজেক্টর রয়েছে ফোল্ডিং করা। দেয়াল ঘেঁষে সেগুন কাঠের বড় আলমারি, ফাইল কেবিনেট। আলমারিতে সারিবদ্ধ বইয়ের সমাহার দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলো মনির।
এর মধ্যে রুমে একজন অল্পবয়সী তরুণী সাথে নিয়ে যিনি প্রবেশ করলেন তাঁকে দেখে মনির রীতিমত হকচকিয়ে গেলো এবং আরো তাজ্জব হলো তাঁর মুখে স্যার সম্বোধন শুনে। মনির জানে, তিনি বিশাল ক্ষমতাধর সরকারি দলের একজন নেতা। মিনহাজ সাহেবকে তিনি যেভাবে স্যার স্যার করে কথা বলছেন তা দেখে মনির মনে-মনে একচোট হেসে নিলো।
স্যার ওনার নাম সেমন্তি, বিশ^বিদ্যালয়ে বাংলা শেষ বর্ষে আছেন। ওনার কথাই বলেছিলাম আপনাকে।
মিনহাজ সাহেব ভালো করে দেখলেন এক নজর, তারপর বেল টিপলেন। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো পিয়ন।
ম্যাডামকে ওনার লাগেজসহ গেষ্টহাউজে নিয়ে যাও। কিচেনে বলে দিও ওনার আপ্প্যায়নে যেন কোনও ত্রুটি না হয়।
স্যার, আমার ফাইলটা?
হয়ে যাবে ওটা, আগামী কাল নিয়ে যেতে পারবেন।
ওনারা চলে গেলে ফাইলটা সাইন করে বেল টিপতেই সহকারী এসে নিয়ে গেল ওটা।
স্যার টেবিলে খাবার লাগিয়েছে, পিয়ন এসে বলে গেল।
হ্যাঁ, আসছি।
মনির চলো খেতে খেতেই তোমার পত্রিকার গল্প শুনবো। মিনহাজ ভাইকে অনুসরণ করে পাশের লাগানো আরেকটি কক্ষে প্রবেশ করে মনির। আবারও অবাক হওয়ার পালা, ছিমছাম মাঝারি একটি গ্লাসটপ টেবিলে বিশাল আয়োজন।
এত খাবার! আরও কেউ আছে নাকি ভাইয়া? অজান্তেই প্রশ্ন করে বসে মনির।
না, আর কেউ নেই
এত খাবার কে খাবে? আমরা দুজনেই? অসম্ভব
আরে খেতে থাক তো, দেখা যাবে
ভাইয়া আমি এত খেতে পারি না বলে মনির সামান্য ভাত, মাছের বিশাল সাইজের পেটি থেকে কেটে অর্ধেকটা নিল।
মিনহাজ ভাই খাসির মাংসের বাটি থেকে জোর করে কয়েকটুকরো মাংস তুলে দিলো। মাছ এবং মাংস একসাথে কখনোই খায় না মনির। বিয়েশাদির নিমন্ত্রণে গেলেও সে যে কোনও একটা নেয়। কিন্তু আজকে তার সে নিয়ম ভাঙতেই হলো।
তুমি তো খুব ভালো কাজ করছো মনির। খবর নিয়েছি। মিনাজ সাহেব হাসতে হাসতে বললেন
চেষ্টা করে যাচ্ছি ভাইয়া, এই আর কি
না না, বর্তমান সময়ে মফস্বলে বসে এমন সুন্দর পত্রিকা এবং সাময়িকী বের করা আবার লেখকদের জন্মদিনের সংখ্যা করা অনেক কঠিন। আজকাল ঢাকার বড় বড় পত্রিকাও এসব করে না।
মনির চুপ করে রইলো।
তোমার একটা বায়োডাটা আমাকে দিয়ে যেও, আমি তো শিমুল মাহমুদকেও পৌরসভায় ঢুকিয়ে দিয়েছি।
মনিরের চোখে জল এসে গেল। আবেগ আর ধরে রাখতে পারলো না।
বিদায় নেওয়ার সময় মিনহাজ ভাই নিজের আসন্ন জন্মদিনের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন।
রিপন মিনহাজের জন্মদিন বেশ জাঁকজমকের সাথে উদযাপিত হলো। মনিরের পত্রিকার রঙিন সাময়িকী আরও রঙিন হলো।
এরপর অনেক দিন আর যোগাযোগ নেই। মনিরও বন্যা, দুর্যোগ, পাঠচক্র, পত্রিকা ভ্রমণ-এটা ওটা নিয়ে ব্যস্ত। এরই মধ্যে তার এত শ্রম সাধনার পাঠাগারটি পোড়ানো হলো- বই, পত্রিকা, যা যা ছিল সব ছাই হয়ে গেলো। ওর বাড়ি চুরি হলো, মায়ের সামান্য অলঙ্কার ছিল, চোর রেখে যায়নি।
মিনহাজ ভাইয়ের প্রমোশন হয়েছে এর মধ্যে, বদলি হয়ে আবার ঢাকায় গিয়েছেন সে খবর তার পত্রিকার সম্পাদক দিয়েছেন। মনির প্রায় ভুলেই গিয়েছিল মিনহাজ ভাইয়ের কথা। কত কবি সাহিত্যিকই তো তাকে কত কথা বলে! সব তার পক্ষে মনে রাখা সম্ভবও নয়।
কিন্তু সেদিন নবীনচন্দ্র সেন লাইব্রেরির চত্বরে সমীরের সাথে দেখা হলে সে-ই আবার মিনহাজ সাহেবের কথা মনে করিয়ে দিলো। সমীরের সাথে লেখালেখির সূত্র ধরেই মনিরের পরিচয়। সমীর ভালো গল্প লেখে। প্রাইভেট একটা ব্যাংকের জুনিয়র পোষ্টে আছে। শহরের যান্ত্রিক কোলাহলের মাঝে সমীর যেন একলা এক অবিন্যস্ত কবিতা, যে প্রতিদিন সকাল ন’টায় প্রাইভেট ব্যাংকের খাঁচায় নিজের স্বাধীন ইচ্ছাকে বন্দি করে। কাচের জানালার ওপারে যখন রোদ এসে পড়ে, সমীরের মনে হয় সে কোনো এক বন্দিশালায় বসে সংখ্যার হিসাব মেলাচ্ছে, অথচ তার মন পড়ে থাকে সুদূর গ্রামের ধূলিময় মেঠোপথে, যেখানে তার পরিবার এক চিলতে সুখের আশায় দিন গোনে। এই কৃত্রিম জীবনের ক্লান্তি মুছতে সমীর আশ্রয় নেয় শব্দের মায়াজালে, যেখানে কলমের আঁচড়ে সে মুক্তি খোঁজে জীবনানন্দের রূপসী বাংলার মতো কোনো এক নিভৃত ভুবনে।
লেখালেখির এই যৌথ সাধনাতে মনিরের সাথে দেখা হলে তপ্ত দুপুরে এক পশলা বৃষ্টির মতো মনে হয়। নবীনচন্দ্র সেন লাইব্রেরি চত্বরের প্রাচীন বটের মূলে বসে তাদের আড্ডা জমে ওঠে, যেখানে চায়ের কাপের ধোঁয়ায় উড়ে যায় মনের যত কষ্ট, হতাশা। সেই প্রাচীন লাইব্রেরি প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে তাদের ভাবনার চারণভূমি; সমীর সেখানে ব্যাংকের ফাইলপত্র ভুলে মনিরের সাথে বুনে চলে একের পর এক না-বলা গল্পের প্লট। একদিকে গ্রামের চেনা মুখের টান আর অন্যদিকে শহরের জীবিকার নিষ্ঠুর টানাপোড়েনÑএই দুই বিপরীত স্রোতের মাঝে দাঁড়িয়ে সমীর যেন এক আধুনিক উপন্যাসের ট্রাজিক নায়ক, যে দিনে সংখ্যার হিসাব মেলায় আর রাতে লাইব্রেরি চত্বরের নির্জনতায় মনিরের সাথে শব্দের ভেলায় চড়ে খুঁজে ফেরে নিজের হারিয়ে যাওয়া আকাশ।
তুমুল এক ঝড় বয়ে গিয়েছিল সেদিন সমীরের বুকের ওপর দিয়ে, যখন ম্যানেজার নিস্পৃহ মুখে তাকে ছাঁটাইয়ের আভাস দিলেন। সন্ধ্যায় নবীনচন্দ্র সেন লাইব্রেরি চত্বরের কোলাহল ছাপিয়ে সমীরের কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল এক টুকরো মেঘ ভাঙা দীর্ঘশ্বাস। সে মনিরের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলল, “আমার চাকরিটা বোধহয় আর থাকছে না, মনির ভাই; এই কর্পোরেট খাঁচা থেকে খুব শিগগিরই আমি চিরতরে মুক্ত হয়ে যাচ্ছি।” কথা কটি যেন লাইব্রেরির প্রাচীন দেয়ালে আছড়ে পড়া এক আর্তনাদ, যা মুহূর্তেই চত্বরের চেনা আড্ডার আবহকে থমকে দিল।
মনিরের চোখের পাতায় তখন এক বিষাদময় বিস্ময়, যেন কোনো এক প্রিয় উপন্যাসের শেষ পাতাটি আচমকা ছিঁড়ে গেছে। সমীর দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে শহরের নিয়ন আলোয় গ্রামের সেই ধূলিময় মেঠোপথ আর মায়ের চিন্তিত মুখচ্ছবি ভেসে উঠছিল। চাকরি চলে যাওয়া মানে কেবল একটা পদ হারানো নয়, বরং গ্রামের সেই চিলতে ঘরের প্রদীপ নিভে যাওয়ার উপক্রম হওয়া, যেখানে সবাই তার সামান্য আয়ের ওপর ভরসা করে বাঁচে। পাতা ঝরার শব্দে তখন এক অদ্ভুত শূন্যতা, আর সমীর যেন এক জলমগ্ন নাবিক, যে নিজের ডুবন্ত নৌকার ওপর দাঁড়িয়েও মনিরের চোখের দিকে তাকিয়ে শব্দের মাঝে তার শেষ আশ্রয়টুকু খুঁজছিল।
কোনও একটা গ্রুপ অব কোম্পানির পলাতক চেয়ারম্যান এর আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত বলে অনেকের সাথে সমীরকেও চাকরি থেকে বরখাস্ত করার চিঠি দেওয়া হয়েছে। চাকরিটা তখন না গেলেও নিশ্চিত চলে যাবে, এটা সে বুঝতে পেরে মনিরের সাথে শেয়ার করতেই মনিরের প্রথমে যার কথা মনে হলো তিনি রিপন মিনহাজ।
নিজের জন্যে কারও কাছে কিছু না চাইলেও সমীরের জন্য মিনহাজ ভাইকে বলতেই হবে। তিনি আবার সমীরকেও চেনেন লেখালেখির সূত্রেই। সেদিন সমীরকে সেকথা বলে আশ্বস্ত করেছিলো মনির।
কয়েক দিন পরেই চাকরি হারিয়ে বেকার সমীর শহরের কৃত্রিম আলো আর জীবিকার নিষ্ঠুর টানাপোড়েনকে পেছনে ফেলে গ্রামে ফিরে গেছে যেখানে সাঙ্গু নদীর বাতাস আর মায়ের আঁচলের গন্ধ তাকে পরম শান্তিতে বুকে টেনে নিয়েছে। বটতলার সেই মুখর আড্ডা আর নবীনচন্দ্র সেন লাইব্রেরি চত্বর তখন সুদূর অতীত, ঠিক যেন কোনো এক অসমাপ্ত গল্পের খসড়া পাতা। চাকরির আশা ছেড়ে সে লেখালেখি আর পৈতৃক ছোট্ট ব্যবসা এবং জমিজমায় মনোযোগী হয়েছে। যে হাত এতদিন ব্যাংকের কম্পিউটারের কিবোর্ডে সংখ্যার হিসাব মেলাতো, সেই হাত এখন ব্যস্ত হয়ে উঠল চাল, ডাল আর তেলের খাঁটি গ্রামীণ পরিমাপে। এই ক্ষুদ্র ব্যবসাই এখন তার পরিবারের বেঁচে থাকার সম্বল, যেন এক চিলতে ভাঙা ঘরের শক্ত খুঁটি।
তবে সমীরের ভেতরের লেখক সত্ত্বাটি মরে যায়নি, বরং গ্রামীণ জীবনের এই ধূলিময় ক্যানভাসে তা আরও জীবন্ত রূপ নিল। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে, যখন চরাচরে নিঝুম রাত নামে, সমীর তখন বসে তার খাতা-কলম নিয়ে। দোকানের ক্যাশবাক্সের এক কোণায় সবসময় থাকে তার ডায়েরি, যেখানে ক্রেতাদের ভিড়ের মাঝেই সে টুকে রাখে কোনো গ্রামীণ চরিত্রের স্কেচ বা মেঠোপথের কোনো রূপক উপমা। তার প্রতিটি লেখায় এখন মূর্ত হয়ে উঠে খেটে খাওয়া মানুষের সুখ-দুঃখের মহাকাব্য।
ক্ষমতার উচ্চ অলিন্দে রিপন মিনহাজ এমন এক নক্ষত্র, যাঁর ক্ষণিকের উজ্জ্বলতাকে মনির অবোধ চাতকের মতো ধ্রুবতারা বলে ভুল করেছিল। রিপন মিনহাজ রাজধানীর রাজকীয় পরিবেশে গিয়ে ভুলে গেলেন সকল প্রতিশ্রুতি, এক লহমায় কর্পোরেট ফাইলের নিস্পৃহ স্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেল এক চিলতে মানবিকতার উপাখ্যান।
সমীরের আকস্মিক চাকরিচ্যুতির পর মনির তার সমস্ত ব্যাকুলতা আর বন্ধুত্বের আর্তি নিয়ে রিপন মিনহাজের কাছে ফোন করেছে বার বার, হোয়াটস অ্যাপে, ম্যাসেঞ্জারে চেষ্টা করেছে তাঁর কাছে পৌঁছার কিন্তু অপর প্রান্তের চরম উদাসীনতার দেয়ালে আছড়ে পড়ে বারবার স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। যে প্রতাপশালী পুরুষ একদা শ্রাবণ-মেঘের মতো আশ্বাসের বৃষ্টি ঝরিয়েছিলেন, ওপাশ থেকে আর কোনদিন তাঁর কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি…














































