ফিচার এলাটিং বেলাটিং

নদী যে ছেলেটার নাম জানত

পান্থজন জাহাঙ্গীর »

বর্ষাকালে আমাদের গ্রামের পাশের ছোট নদীটা খুব বদলে যায়। শীতকালে যেখানে হেঁটে পার হওয়া যায়, বর্ষায় সেখানে নৌকা চলে। বাবা সব সময় বলতেন,
‘নদীর সঙ্গে বন্ধুত্ব করবি, কিন্তু তাকে কখনো ছোট ভাববি না।’
আমি প্রতিদিন বিকেলে নদীর ধারে যেতাম। নদীর জল দেখতে আমার খুব ভালো লাগত। একদিন বৃষ্টি থেমেছে। আকাশে হালকা রোদ। আমি নদীর পাড়ে বসে ছোট ছোট পাথর জলে ছুড়ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, কেউ যেন আমাকে ডাকল।
‘হৃদয়…’
আমি চারদিকে তাকালাম। কেউ নেই।
আবার…
‘হৃদয়…’
আমি উঠে দাঁড়ালাম। নদীর ওপারে কেউ নেই। কাশবনের ভেতরও না। আমি বাড়ি ফিরে মাকে বললাম,
‘মা, নদী কি কথা বলতে পারে?’
মা হেসে বললেন,
‘তুই বেশি গল্প পড়ছিস।’
পরদিন আবার গেলাম। আজও সেই ডাক। একই রকম। আমি সাহস করে বললাম,
‘কে?’
কোনো উত্তর নেই। শুধু নদীর ঢেউ তীরে এসে লাগল।
ছপ…
ছপ…
তারপর বাতাস উঠল। কাশফুল দুলে উঠল। মনে হলো, নদী হাসছে। আমি প্রতিদিন যেতে শুরু করলাম। যেদিন যেতাম না, সেদিন কেমন যেন খারাপ লাগত। এক বিকেলে দেখি, নদীর ধারে একটা বুড়ো মাঝি বসে জাল সেলাই করছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
‘কাকু, নদী কি মানুষের নাম জানে?’
মাঝি কাজ থামালেন না। শুধু বললেন,
‘যারা রোজ আসে, তাদের নাম নদী ভুলে না।’
আমি চুপ করে গেলাম। বর্ষা প্রায় শেষ। একদিন বাবা বললেন,
‘চল, শহরে যাব। কয়েক মাস মামার বাড়ি থাকবি।’
যাওয়ার আগের বিকেলে আমি শেষবারের মতো নদীর কাছে গেলাম। অনেকক্ষণ বসে রইলাম। কিছুই হলো না। আমি উঠে চলে আসছি। ঠিক তখনই বাতাসের সঙ্গে ভেসে এলÑ
‘হৃদয়…’
আমি পেছনে তাকালাম। নদী আগের মতোই বয়ে যাচ্ছে। কেউ নেই। আমি শুধু হাত নেড়ে বললাম,
‘আমি আবার আসব।’
চার মাস পরে যখন ফিরলাম, তখন শীত। নদী অনেক সরু হয়ে গেছে। আমি দৌড়ে পাড়ে গেলাম। বসে রইলাম।
কেউ ডাকল না। আমি একটু মন খারাপ করে বাড়ি ফিরলাম। দাদু জিজ্ঞেস করলেন,
‘কী হয়েছে?’
আমি সব বললাম। দাদু হেসে বললেন,
‘বর্ষার নদী আর শীতের নদী এক নয়।’
তারপর একটু থেমে বললেন,
‘তবে যারা মন দিয়ে শোনে, তাদের সঙ্গে নদী সব ঋতুতেই কথা বলে।’
পরের বর্ষায় আবার নদী ফুলে উঠল। আমি আবার গেলাম। চুপচাপ বসে আছি। হঠাৎ… বাতাস এল। ঢেউ এল। আর খুব আস্তে… মনে হলো, কেউ যেন আবার বলছেÑ
‘হৃদয়…’
আমি আর খুঁজতে গেলাম না। কারণ এবার আমি জানতামÑ নদীকে চোখ দিয়ে দেখা যায়। কিন্তু তাকে শোনা যায় শুধু মন দিয়ে।