এ মুহূর্তের সংবাদ

ত্রাণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে

চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল আজ এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি। স্মরণকালের এই আকস্মিক বন্যায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র চট্টগ্রামের ছয়টি উপজেলাতেই প্রায় পৌনে আট লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। পাহাড়ে ও বন্যায় শিশুসহ ইতিমধ্যে অনেকের প্রাণহানি ঘটেছে, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা কমতে শুরু করলেও উপদ্রুত এলাকাগুলোর মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। ঘরবাড়ি ধ্বংস, রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন এবং কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি জনজীবনকে স্থবির করে দিয়েছে।
এই মুহূর্তে বন্যাদুর্গত এলাকার সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র অভাব। অধিকাংশ নলকূপ ও নিরাপদ পানির উৎস বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় পানিবাহিত রোগ ছড়ানোর চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একদিকে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে বা খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে, অন্যদিকে বেঁচে থাকার ন্যূনতম উপাদান—খাবার ও পানির জন্য হাহাকার করছে। অনেক এলাকায় কাঁচা ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশে গেছে, টিনের চালা উড়ে গেছে। ঘরবাড়ি কীভাবে মেরামত করবে—সেই দুশ্চিন্তার চেয়েও এখন প্রতি মুহূর্তের ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মেটানোই মানুষের প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারিভাবে ত্রাণ পৌঁছাতে শুরু করলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বহু দুর্গত এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছায়নি। আশ্রয়কেন্দ্রের মানুষও ত্রাণের অভাবে অভুক্ত দিন কাটাচ্ছে বলে খবর আসছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং কিছু এলাকায় এখনো হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি থাকার কারণে ত্রাণ বিতরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ঠিকই, তবে এই সংকটের দ্রুত সমাধান জরুরি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে সহায়তা পৌঁছাতে প্রশাসনকে যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। কোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা অনিয়ম ছাড়াই প্রতিটি দুর্গত মানুষের দ্বারে দ্বারে খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি ওষুধ পৌঁছে দিতে হবে।
বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া আরও বড় চ্যালেঞ্জ। চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর মতো উপজেলাগুলোয় কৃষিজমি, বিশেষ করে শঙ্খ নদের চরাঞ্চলের সবজিখেত পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সড়ক ও সেতু ধসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের উচিত হবে অবিলম্বে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। চিকিৎসকদের মেডিকেল টিম গঠন করে পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন, ঘরবাড়ি মেরামতে আর্থিক সহায়তা এবং ভেঙে পড়া অবকাঠামো দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এই জাতীয় সংকটে কেবল সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, দেশের বিত্তবান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সাধ্যমতো দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই পারে চট্টগ্রাম অঞ্চলের এই বিপুল ক্ষত দূর করে জনজীবনকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে।
-advertise-