বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৩, ২০২৬
ফিচার শিল্প-সাহিত্য

চেতনার অগ্নিমশাল নজরুল

১১ জ্যৈষ্ঠ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তীতে কবির প্রতি অতল শ্রদ্ধা

কামরুল হাসান বাদল »

১৯৭১ সাল, বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবের বছর| সুদীর্ঘ বছর ধরে বাঙালি শাসিত হয়েছে, শোষিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নামের অঞ্চলে, ভিন্ন ভিন্ন শাসকের দ্বারা| এই প্রথম বাঙালি অর্জন করে ¯^শাসিত রাষ্ট্র, লাল সবুজের পতাকা আর প্রিয় মানচিত্র| এবং সে সাথে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি
জাতিরাষ্ট্র, একটি ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র| তারপরের বছর, ১৯৭২ সাল ইতিহাসের আরও একটি উজ্জ্বলতম বছর, যে সময় রচিত হয় ¯^াধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান, তথা বিশ্বের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান| যে সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মূল চার নীতি, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে গৃহীত হয় ধর্মনিরপেক্ষতা| যে সংবিধান রাষ্ট্রের ধর্ম-বর্ণ, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে সমান মর্যাদা ও অধিকার প্রদান করেছে| এই বছরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে এই ¯^াধীন দেশে নিয়ে আসেন এবং তাঁকে জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ধানমন্ডিতে তাঁর নামে একটি বাড়ি বরাদ্দের মাধ্যমে এদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেন| কবি আমৃত্যু ওই বাড়িতেই অবস্থান করেছিলেন|
এই ঘটনাটিকে আমি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করি| কারণ বিদ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, মানবতার কবি- যার জীবন ও তাঁর কাব্য সাধনা দিয়ে, সঙ্গীত, দর্শন, চিন্তা ও কর্ম দিয়ে যে অসাম্প্রদায়িক সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশ ছিল সে স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন| যুগ যুগ ধরে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে অনৈক্য, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে নজরুল যে বিদ্রোহ করেছেন, কলম ধরেছেন তা যেনো সফল হয়েছিলো ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে| যে দেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ও যুদ্ধে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান নির্বিশেষে সবাই অংশ নিয়েছে, প্রাণ দিয়েছে, সম্ভ্রম দিয়েছে; মুক্তির পর, ¯^াধীনতার পর সেই রাষ্ট্র সকল ধর্মের, সকল মানুষের হবে বলে রাষ্ট্র নিজেই নিশ্চয়তা দিয়েছে|
কিন্তু দুর্ভাগ্য জাতির, দুর্ভাগ্য জাতীয় কবির| সে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতাও কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে নজরুল আজীবন বিদ্রোহ করেছেন, সংগ্রাম করেছেন সে শক্তির বরং বলা উচিত অপশক্তির হাতে অস্ত্র হয়ে উঠেছেন তিনি, ব্যবহৃত হচ্ছেন তিনি| মানবতার এই মহান কবিকে শুধুমাত্র মুসলমানদের কবি বানিয়ে তাঁর সর্বজনীন রূপকে বিকৃত করা হচ্ছে| অথচ এদের বিরুদ্ধেই কবি উচ্চারণ করেছিলেন,
“গাহি সাম্যের গান,
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম খ্রিষ্টান
গাহি সাম্যের গান…
তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান
সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ…
মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন মন্দির কাবা নাই|”
(সাম্যবাদী)
এই ভারতবর্ষেই বহুপূর্ব এক মনীষি উচ্চারণ করেছিলেন, “সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই|” সেই মহান মানবতাবাদীর উত্তরাধিকারী নজরুলও মানুষকে দিয়েছেন অসাধারণ মর্যাদা ও মহত্ব| তিনি বলেছেন,
“গাহি সাম্যের গান,
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান|
-পূজারী দুয়ার খোলো
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হলো|
-ভূখারী ফুকারী কয়
ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়|”
মন্দিরে যেমন ভূখারীর ঠাঁই হয় না তেমনি মসজিদেও নয়-
“আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু
আমার ক্ষুধার অন্ন তাই বলে বন্ধ করনি প্রভু|
তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি
মোল্লা পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি|
হায়রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে ¯^ার্থের জয়|
…মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ; গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো|”
-(মানুষ)
এত উচ্চকণ্ঠে, এত নির্দ্বিধায় মানুষের জয়গান কে গেয়েছে কোথায় একা নজরুল ছাড়া? উনি অন্যকে দেখেছেন মানুষের দৃষ্টিতে| ধর্মের পরিচয়ে নয়, তাই তিনি উদাত্তভাবে বলতে পারেন, “হিন্দু না মুসলিম তা জিজ্ঞাসে কোন জন/কাণ্ডারী বল, ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মার/”
নজরুল তো সাম্যবাদেরও কবি| একটি শ্রেণীহীন-শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থার শুধু ¯^প্ন দেখেননি, দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণও করেন এভাবে-
“বলতো এসব কাহাদের দান? তোমার অট্টালিকা
কার খুনে রাঙা? ঠুলি খুলে দেখ প্রতি ইটে আছে লিখা
তুমি জান না’ক কিন্তু পথের প্রতি ধুলিকণা জানে
ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট অট্টালিকার মানে
আসিতেছে শুভদিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ|”
বিশ্বের সকল অনাচার, অত্যাচার আর উৎপীড়নের বিপক্ষে বলতে পারেন হুঙ্কার দিয়ে-
“মহা বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেই দিন হবো শান্ত
যবে, উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না|” -(বিদ্রোহী)
বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছিলো এক মহান চেতনা নিয়ে যা আমি পূর্বেও উল্লেখ করেছিলাম| সে চেতনা কী? নজরুল সারাজীবন যা বলে এসেছিলেন তাই| ধর্মনিরপেক্ষ শোষণহীন এক সমাজব্যবস্থা| বাংলাদেশের যাত্রাও শুরু হয়েছিলো জাতীয় কবির এই চেতনাতে| কিন্তু ’৭১ এর পরাজিত শক্তি এদেশে আবার পাকিস্তানি ভাবধারায় সাম্প্রদায়িকতাকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়| এরা নজরুলকে অপমানিত করে তাঁকে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করতে গিয়ে| এদের চোখে নারী শুধু ভোগের আর সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র| এ চরিত্র তাদের নতুন নয়, তাই বহু আগেই নজরুল লিখেছিলেন|
“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর|
সেদিন সুদূর নয়
যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়|”
-(নারী)
আজ ধর্মকে হাতিয়ার করে যারা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়, ধর্মের ভিত্তিতে যারা মানুষে মানুষে বিভেদ ˆতরি করে ক্ষমতায় যেতে চায়, অন্য ধর্মের প্রতি যখন প্রচণ্ড ঘৃণা ছড়িয়ে দিয়ে সমাজ তথা দেশকে অস্থিতিশীল ও মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় তখন নজরুলের উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে হয়,
“ধর্মান্ধরা শোনো,
অন্যের পাপ গনিবার আগে নিজেদের পাপ গনো|”
প্রকৃতপক্ষে নজরুল আছেন এদেশের লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয়ে, কারণ ’৭১ এর চেতনায় বাংলাদেশ তো নজরুলেরই বাংলাদেশ| জাতীয় কবি নজরুলের প্রকৃত মর্যাদা তো সেদিনই প্রতিষ্ঠিত হবে যেদিন এই বাংলাদেশ হবে সকল ধর্মের, সকল বর্ণের নারী পুরুষ ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে|
অন্যদিকে আবার তিনিই লিখেছেন, “হে নামাজি আমার ঘরে নামাজ পড় আজ”, “মসিজেরদই পশে আমার কবর দিও ভাই” বা “খোদার প্রেমে শরাব পিয়ে বেহুঁশ হয়ে রই পড়ে|” তখন কি তাঁকে আমাদের কছে সাম্প্রদায়িক মনে হয়? সে সাথে তিনি যখন শ্যামসঙ্গীত, ভজন লিখে, গেয়ে সমগ্র হিন্দু সম্প্রদায়কে বিস্মিত করে দেন তখন কী মনে হয়? নজরুল ইসলামি গান না লিখলে বাঙালি মুসলিম পরিবারে সঙ্গীত প্রবেশ করতে পারতো সে সময়|
বস্তুত তিনি তো একজন কবি, আর কবিতো ঈশ্বর, ¯^ার্বভৌম, তাই তিনি বলতে পারেন,
“কে তুমি খুঁজিতেছো জগদীশে ভাই আকাশ পাতাল জুড়ে?
কে তুমি ফিরিছ বনে-জঙ্গলে কে তুমি পাহাড় চুড়ে?
হায় ঋষি দরবেশ
বুকের মানিকে বুকে ধরে তুমি খোঁজ তারে দেশ দেশ|”
নজরুল মানবধর্মের কথা বলেছেন, মানুষের জয়গান গেয়েছেন| আজ সারা বিশ্ব যখন মানবতার লাঞ্ছনায় অপমানিত, পুঁজিবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ভোগবাদীতায় পর্যবসিত, সমাজকে অমানবিক করে তুলবার সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত এবং কখনও জিহাদের নামে নিষ্পাপ নিরপরাধ মানুষের রক্তে যখন ধরণী সিক্ত হয় তখন নজরুল ও তাঁর চেতনা, আদর্শ ছড়িয়ে দেয়া ছাড়া, অধিকতর চর্চা করা ছাড়া আমাদের গত্যন্তর নেই|
সমাজ থেকে এই অন্ধকার, ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডুকতা দূর করতে এখনও নজরুলই আমাদের চেতনার অগ্নিমশাল|

---------