এ মুহূর্তের সংবাদ

গ্যাসে পানি মেশানোর সাজা কি নামমাত্র জরিমানা

সম্প্রতি খাগড়াছড়ি সদরে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারে গ্যাসের পরিবর্তে পানি মিশিয়ে বিক্রির এক চরম উদ্বেগজনক ঘটনা সামনে এসেছে। একজন সচেতন গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছেন। কিন্তু এর চেয়েও বড় বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে অপরাধের পরিধি ও শাস্তির মাত্রার মধ্যকার আকাশ-পাতাল ব্যবধান। সিলিন্ডারে পানি মেশানোর মতো একটি মারাত্মক অপরাধের জন্য দুটি দোকানকে যথাক্রমে ৫ হাজার ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, এই নামমাত্র জরিমানা কি অপরাধের ভয়াবহতার সাথে এক ধরনের নির্মম রসিকতা নয়?

এলপিজি সিলিন্ডারে পানি মেশানো স্রেফ পরিমাপে কম দেওয়ার সাধারণ কোনো চুরি বা প্রতারণা নয়; এটি একটি উচ্চমাত্রার বিপজ্জনক অপরাধ এবং একাধারে বড় ধরনের একটি নাশকতা।
সিলিন্ডারের ভেতরে নির্দিষ্ট চাপে এলপিজি তরল আকারে থাকে। এর ভেতরে যদি পানি প্রবেশ করানো হয়, তবে সিলিন্ডারের ভেতরের দেয়ালে দ্রুত মরিচা ধরতে শুরু করে। ভেতরে মরিচা ধরলে ইস্পাতের তৈরি সিলিন্ডারের দেয়াল ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং যেকোনো মুহূর্তে তা বোমার মতো বিস্ফোরিত হতে পারে।
রান্নার সময় চুলার লাইনে গ্যাসের সাথে পানির কণা চলে এলে আগুন আকস্মিকভাবে নিভে যেতে পারে। অথচ চুলার চাবি চালু থাকার কারণে পুরো রান্নাঘরে অদৃশ্য গ্যাস ছড়িয়ে পড়বে। পরবর্তীতে দেশলাই বা লাইটার জ্বালাবামাত্রই সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা প্রচুর।
একজন সাধারণ গ্রাহক এক মাসের রান্নার জন্য যে অর্থ ব্যয় করছেন, তা দুই সপ্তাহেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এটি একটি অভিনব ও জঘন্য ফাঁদ।
গ্যাস সিলিন্ডার কোনো সাধারণ মুদি পণ্য নয়। এটি একটি অতি দাহ্য ও বিস্ফোরক পদার্থ। এর ভেতরে সামান্যতম হেরফের বা ভেজাল মানেই একেকটি পরিবারকে জীবন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর বসিয়ে দেওয়া। অথচ খাগড়াছড়ির ঘটনায় আমরা দেখলাম, লাইসেন্স ও অনুমোদনহীনভাবে এমন বিপজ্জনক ব্যবসা চালানোর পরও অপরাধীদের কেবল কয়েক হাজার টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হলো। এই সামান্য জরিমানা লোভী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের সতর্ক করার চেয়ে বরং অপকর্মে আরও উৎসাহিত করবে। ২৫ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে যদি লাখ টাকার জালিয়াতি নির্বিঘ্নে চালানো যায়, তবে অপরাধীরা কেন থামবে?
এখানে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসনের তৎপরতা প্রশংসনীয় হলেও, শাস্তির আইনি সীমাবদ্ধতা বা প্রয়োগের শিথিলতা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ বা বিস্ফোরক আইনকে আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করার সময় এসেছে। কেবল খুচরা বা পাইকারি বিক্রেতাই নয়, এই চক্রের মূল হোতা বা কোনো রিফিলিং সিন্ডিকেট এর সাথে জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখা জরুরি।
জননিরাপত্তা নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার কোনো সুযোগ নেই। খাগড়াছড়ির এই ঘটনাকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে দেশজুড়ে এলপিজি সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। সিলিন্ডারে পানি মেশানোর মতো বিপজ্জনক অপরাধকে ‘হত্যাপ্রচেষ্টা’ বা ‘নাশকতা’র সমতুল্য গণ্য করে অপরাধীদের সিলগালা, লাইসেন্স বাতিল এবং দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের আওতাভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ঘরে ঘরে জ্বলতে থাকা রান্নার চুলাগুলো একেকটি মরণফাঁদে পরিণত হবে।