সুপ্রভাত ডেস্ক »
মাত্র ১ হাজার ৮৫০ জন ধারণক্ষমতার চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বর্তমানে বন্দি রয়েছেন ৬ হাজার ৯ জন। মহানগরের ১৬টি থানার মামলার অন্তত ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার আসামি এখানে রয়েছেন। পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন থানার মামলার আরও প্রায় দেড় হাজার আসামিও একই কারাগারে বন্দি। অতিরিক্ত বন্দির চাপে হিমশিম খেতে হচ্ছে কারা প্রশাসনকে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, জেলখানার ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দির সংখ্যা অনেক বেশি। এটি অত্যন্ত ওভারলোডেড একটি কারাগার। জায়গার সংকট থাকায় এটিকে বড় করাও সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে যদি কোনো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে। বিষয়টি নিয়ে আমরা সবসময় উদ্বিগ্ন থাকি।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে সাধারণ সময়ে মাদক আইনের প্রায় আড়াই হাজার এবং জলদস্যু আইনে গ্রেফতার ৬০০-এর বেশি আসামি বন্দি থাকেন। এছাড়া বিভাগীয় ট্রাইব্যুনালের আসামি, মিয়ানমারের প্রায় সাড়ে তিনশ রোহিঙ্গা এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী বাহিনীর দুর্ধর্ষ সদস্যরাও এখানে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই গোষ্ঠীগুলোর একটি অংশ চট্টগ্রামে অপরাধ ও সন্ত্রাস বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
এ অবস্থায় মহানগর ও জেলার বন্দিদের পৃথক রাখা এবং মাদক মামলার আসামি ও রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা কারাগার গঠনের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষের ডিআইজি (প্রিজন) মো. ছগির মিয়া বলেন, মাদক মামলার বন্দিদের জন্য একটি আলাদা জোন করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। মহানগর এলাকার বন্দিদের অন্যত্র এবং কিশোর বন্দিদের জন্যও পৃথক ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরোনো কারাগারটিতে শুধু চট্টগ্রাম জেলার বন্দিদের রাখা হবে।
এতে বিভিন্ন ধরনের বন্দিরা আলাদা থাকবে এবং তাদের মধ্যে যোগাযোগ বা পরামর্শের সুযোগ কমবে, ফলে অপরাধও কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। মহানগরের বন্দিদের স্থানান্তরের জন্য জঙ্গল সলিমপুরে নতুন কারাগার নির্মাণের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
তবে বিশ্বের অনেক দেশেই একই কারাগারের ভেতরে আলাদা সেল বা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বন্দিদের রাখা হয়। তাই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কারা কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক বলেন, একই কারাগারে থাকলেও বন্দিদের জন্য আলাদা সেল ও ব্যবস্থাপনা থাকে। তবে একই স্থানে বিভিন্ন ধরনের অপরাধী থাকলে তাদের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। এতে ছোট অপরাধীরা বড় অপরাধীদের সংস্পর্শে এসে আরও অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালত ভবনের দূরত্ব ৫০০ গজেরও কম। কিন্তু অপরাধের ধরন ও অঞ্চলভিত্তিকভাবে কারাগার ভাগ করা হলে সমস্যা কমার বদলে আরও বাড়তে পারে বলে মনে করেন আইনজীবী নেতারা। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাঈনুদ্দিন বলেন, একজন আসামির বিরুদ্ধে অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের একাধিক মামলা থাকে। সেক্ষেত্রে তাকে কি একাধিক কারাগারে রাখা হবে? এতে হাজার হাজার মামলা ও নথি পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিষয়টি নতুন ধরনের বৈষম্যও তৈরি করতে পারে।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট তারিক আহমেদ বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন ব্যয়বহুল প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বরং কারাগারের ভেতরেই অপরাধের ধরন অনুযায়ী আলাদা সেলে বন্দিদের রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
কারাবিধি অনুযায়ী একজন বন্দির জন্য ঘুমানোর জায়গা হিসেবে ৩৬ বর্গফুট এবং চলাফেরার জন্য আরও ১০০ বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ থাকার কথা। কিন্তু ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কারাগারে বন্দির সংখ্যা ধারণক্ষমতার অনেক বেশি হওয়ায় সেই সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কারাগার বিভাজনের পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত থাকলেও শতবর্ষী চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সংস্কার ও আধুনিকায়নের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




















































