মোহছেনা ঝর্ণা »
সমুদ্র গুন্ডলীর ভীষণ প্রিয়। গুন্ডলীর মায়েরও প্রিয়। তাই তো সময় পেলেই গুন্ডলী তার বাবা- মায়ের সাথে সমুদ্র দেখতে যায়। সমুদ্রের তীরে হাঁটতে তার খুব ভালো লাগে। বড় বড় ঢেউ এসে পা ভিজিয়ে দেয়। সৈকতে বাবা- মাকে নিয়ে বালি দিয়ে ঘর বানায়, খেলনা বানায়। আবার কাঠি দিয়ে নিজের নাম লেখে, বাবার নাম লেখে, মায়ের নাম লেখে। ঢেউ এসে সেই নামগুলিও মুছে দিয়ে যায়।
সমুদ্রের পানিতে নামতেও গুন্ডলীর খুব ভালো লাগে। কিন্তু সে চাইলেই পানিতে নামতে পারে না। মা শুধু চিৎকার করে, আর যেও না, আর যেও না, চলে এসো, ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
একদিন হয়েছে কী, গুন্ডলী সমুদ্রের তীর দিয়ে একা একা হাঁটছিল আর নুড়ি কুড়াচ্ছিল, নুড়ি কুড়াতে কুড়াতে খেয়াল করল সমুদ্রের ঢেউয়ের মধ্যে থেকে কী যেন একটা বের হয়ে এলো। মাছের মতো। কিন্তু মাছ না।
সে তো হঠাৎ করে একটু ঘাবড়ে গেল। এটা আবার কী? ও যেই না ওর বাবা- মাকে চিৎকার করে ডাকতে গেল ওমনি ঐ মাছের মতো জিনিসটা তাকে বলল, এই গুন্ডলী তুমি আমাকে চিনতে পারনি?
গুন্ডলী চোখ বড় বড় ভাবছিল, ও আমার নাম জানল কীভাবে? কিন্তু মুখে বলল, না, আমি তোমাকে চিনতে পারছি না। তুমি কে?
তখন মাছের মতো দেখতে ঐ জিনিসটা বলল, বারে, আমি তো তোমার বন্ধু। আমি মৎস্যকন্যা। তোমার মা না, তোমাকে কাল রাতে আমার গল্প শুনিয়েছে। আমি খুব মন খারাপ করেছি, তুমি কেন আমাকে চিনতে পারনি? আমি তো ঠিকই তোমাকে চিনেছি।
মৎস্যকন্যার মন খারাপ দেখে গুন্ডলীর মায়া হলো। তাই সে বলল, বন্ধু, কিছু মনে করো না, আমি এখন তোমাকে চিনতে পেরেছি।
মৎস্যকন্যা বলল, বন্ধু তাহলে তুমি এখন আমাদের বাসায় বেড়াতে আসো।
গুন্ডলী বলল, তোমাদের বাসা কোথায়?
মৎস্য কন্যা জবাব দিল, এই তো এখানে, সমুদ্রের তলদেশে।
গুন্ডলী অবাক হয়ে বলল, সমুদ্রের তলদেশে? পানির নিচে কীভাবে থাকো তোমরা?
মৎস্যকন্যা হাসতে হাসতে বলল, তোমরা যেভাবে ডাঙায় থাকো, আমরা সেভাবে সমুদ্রে থাকি।
আমি কীভাবে যাবো, গুন্ডলী জিজ্ঞেস করল।
মৎস্যকন্যা বলল, আমি তোমাকে নিয়ে যাব। তোমার বেশ ভালো লাগবে। আমাদের বাসায় অনেক প্রবাল আছে, ঝিনুক আছে, মুক্তা আছে, নুড়ি আছে, তুমি যাবে বন্ধু?
গুন্ডলী বলল, এখন না, পরে যাব। তুমি বরং আমাদের বাসায় বেড়াতে আসো।
আমরা তো ডাঙায় থাকতে পারি না। পানি ছাড়া আমরা বেশীক্ষণ বাঁচতে পারি না।
গুন্ডলী বলল, আমাদের বাসায় অ্যাকোরিয়াম আছে। তোমাকে সে পানিতে রাখব।
মৎস্যকন্যা বলল, আজ তুমি আমাদের বাসাটা দেখে যাও।
সে বলল, আজ নয়, আরেকবার আসলে যাবো। এখন গেলে আমার বাবা- মা আমাকে খুঁজে না পেলে অনেক টেনশন করবে। আচ্ছা বন্ধু ,আমি এখন যাই, ঐ দেখো আমার বাবা- মা বসে আছে।
মৎস্যকন্যা বলল, আমার কথা কি তোমার মনে থাকবে বন্ধু?
গুন্ডলী বলল, হ্যাঁ, থাকবে।
তখন মৎস্যকন্যা বলল, হায় হায় আমি তো তোমার মোবাইল নম্বর আর ফেসবুক আইডি জিজ্ঞেস করতে ভুলেই গেছি।
তার কথা শুনে গুন্ডলী ভারি অবাক হলো। মৎস্যকন্যার দেশেও মোবাইল আর ফেসবুক আছে! ফেসবুকের কথা গুন্ডলীও জানে। কারণ তার মা সারাক্ষণ ফেসবুক ফেসবুক করে।
গুন্ডলী বলল, আমার মোবাইলও নেই, ফেসবুক আইডিও নেই।
মৎস্যকন্যা বলল, কোনো সমস্যা নেই, তোমার বাবা- মা যে কোনো একজনের মোবাইল নম্বর আর ফেসবুক আইডি দাও, আর তুমি নিজেও একটা ফেসবুক আইডি খুলে নিও। তাহলে রোজ আমরা কথা বলত পারব। লাইভে আমাদের ছবি দেখতে পারব।
গুন্ডলী বলল, আচ্ছা।
মৎস্যকন্যা বলল, আচ্ছা বলে ভুলে যেও না কিন্তু। ঠিক আছে, তুমি এখন আমার পাশে এসে দাঁড়াও, আমরা সেলফি তুলি। সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোড দিব।
মৎস্যকন্যার কাণ্ড দেখে গুন্ডলী হাসতে হাসতে বলল, তোমার তো দেখছি আমার মায়ের মতো সারাক্ষণ সেলফি তোলার অভ্যাস।
কথা শেষ করে ফিরে আসার সময় মৎস্যকন্যা গুন্ডলীর হাতে একটা ছোট্ট প্রবাল দিয়ে বলল, বন্ধু এই প্রবালটা তোমাকে উপহার দিলাম।
গুন্ডলী ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্রবালটা দেখছিল এমন সময় মনে হলো কে যেন ওর পা ধরে টানছে। ও ভয় পেয়ে চোখ মেলে দেখে, ওর মা ওকে ডাকছে, গুন্ডলী মা ওঠো, ওঠো, স্কুলে দেরি যাচ্ছে।
গুন্ডলী মাকে বলল, মা, মৎস্যকন্যা, আমার বন্ধু কোথায়?
গুন্ডলীর মা বলল, মা, এখনো তোমার মাথায় মৎস্যকন্যা ঘুরছে? আরে ওটা তো গল্প বলেছি।
গুন্ডলীর মনে পড়ল, রাতে ঘুমানোর সময় মা ওকে মৎস্যকন্যার গল্প বলেছিল। কিন্তু মাকে ও কীভাবে বুঝিয়ে বলবে যে, গল্পের সেই মৎস্যকন্যার সাথে স্বপ্নে ওর দেখা হয়েছে।
গুন্ডলী ভাবছে মাকে বলবে যেন ওকে একটা ফেসবুক একাউন্ট খুলে দেয়। তাহলে মাঝে মাঝে সে তার মৎস্যকন্যা বন্ধুর সাথে দেখা করতে পারবে, কথা বলতে পারবে।





















































