ফিচার এলাটিং বেলাটিং

বাড়ির পাশে ইছামতি

এম আব্দুল হালীম বাচ্চু »

লক্ষ্মীপুর গ্রাম থেকে দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে দীর্ঘতম নদী- ইছামতি। বেড়া- সাঁথিয়া হয়ে পাবনায় গিয়ে পদ্মার সাথে মিশে সে নিজের গল্পটাকে আরও বড়ো করেছে। নদীতে শুধু পানি নয়, অনেক স্মৃতি, অনেক হাসিকান্না যেন জীবনের সাথে মিলেমিশে চলছে।
সবুজ ছোটবেলায় প্রায় প্রতিদিনই বন্ধুদের নিয়ে হেঁটে চলে যেত সেই দেড় কিলোমিটার পথ। ধানের ক্ষেতে বাতাস দোল খেত, কাঁচা রাস্তার ধুলা পায়ে লেগে থাকত- তবু ইছামতির কাছে পৌঁছানোর আনন্দে কোনো ক্লান্তিই লাগত না। দূর থেকেই দেখা যেত নদীর বিস্তৃত বুক, বড়ো ঢেউ, আর মাঝেমধ্যে নৌকার সারি।
দাদু বলতেন,— “বেড়া হুরাসাগর থেকে যে পানি নামতে শুরু করে, তা সাঁথিয়া ঘুরে পাবনায় এসে আরও বড়ো হয়ে যায়। এই ইছামতি কিন্তু একসময় আমাদের জীবন চালাত—মাছ, নৌকা, বেচাকেনা- সবই ছিল এর ওপর নির্ভরশীল।”
সবুজের মনে তখন নদীটা যেন একটা জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠত- যে নদী এত দূর দূরান্ত ঘুরে আসতে পারে সে নিশ্চিত পরোপকারী।
কিন্তু এখন যখন সবুজ সেই একই পথে হাঁটে, অনেক কিছুই বদলে গেছে। পথের ধারে আগের মতো সবুজ নেই, আর নদীর কাছাকাছি গেলেই চোখে পড়ে- পানি কমে গেছে, জায়গায় জায়গায় চর জেগেছে। নদীজুড়ে কচুরিপানার আবর্জনা জমে আছে, কোথাও মানুষ দখল করে জায়গা বানিয়েছে।
একদিন সবুজ চুপ করে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল। তার বন্ধু হীরা এসে বলল,—
“কী দেখছিস?”
সবুজ বলল, “ভাবছি, এই নদী এতদূর থেকে আসে বেড়া, সাঁথিয়া ঘুরে পাবনা পর্যন্ত যায়ৃ অথচ আমরা এটাকে ঠিকমতো রাখতে পারছি না!”
হীরা মাথা নেড়ে বলল, “আমাদেরই কিছু করতে হবে।”
সেদিন থেকেই তারা সিদ্ধান্ত নিলো নদীর জন্য কিছু করবে। তারা বন্ধুদের নিয়ে ছোটো একটা দল বানাল। গ্রামের মানুষকে বোঝাতে লাগল, যেন কেউ নদীতে ময়লা না ফেলে। স্কুলের স্যারদের বলল এবং সবাই মিলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানও চালাল।
ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে লাগল। কেউ আর আগের মতো সহজে ময়লা ফেলতে সাহস পায় না। ছোটো ছোটো উদ্যোগে নদীর পাড় আবার একটু করে সুন্দর হতে শুরু করল।
এক সন্ধ্যায় সবুজ দাঁড়িয়ে ছিল ইছামতির পাড়ে। সূর্যের আলো পড়ে নদীর বিশাল বুকে লাল আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। তার মনে হলো এই নদী শুধু বেড়া, সাঁথিয়া, পাবনাকে নয়, তাদের শৈশবকেও এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।
সে আস্তে করে বলল,— “তুই এতদূর পথ পাড়ি দিয়ে আসিস, আমরা তোর যতœ নেব—এটাই আমাদের কথা।” নদীর ঢেউ মৃদু শব্দে যেন সাড়া দিলো।
ইছামতি শুধু একটা নদী নয় এটা আমাদের অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের সেতুবন্ধন। একে বাঁচানো মানেই নিজেদের গল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখা।