এস ডি সুব্রত »
বিদ্রোহী কবি নজরুল একাধারে দ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, সাম্যের কবি তথা মানবতার কবি | মানুষের দুঃখ সুখের কথা, মানবতার কথা, প্রেমের কথা, সাম্যের কথা নজরুলের মতো এত স্পষ্ট করে আর কেউ বলেনি| আমাদের জাতীয় কবি নজরুলের জীবনে দ্রোহ ছিল, ছিল প্রেম| তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিতে দ্রোহের অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে| আবার নজরুলের কবিতায় প্রেমের অনুষঙ্গ বিশেষ ভাবে ধরা দিয়েছে বারবার | তাঁর প্রেমের কবিতায় নারী অনুষঙ্গ উঠে এসেছে| তিনি নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন তার কবিতায় | তাঁর নারী কবিতা পড়লে সহজেই অনুমান করা যায় , তিনি কোন দৃষ্টিতে নারীকে দেখেছেন| সাম্যের গান গাই- ‘আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই!/ বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর|/ বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,/ অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী|/’
‘পিছুডাক’ কবিতায় নিজের মন-মন্দিরে কবি প্রেয়সীর আরাধনা করেছেন| নিজের অসাধারণ কবিত্বশক্তি দিয়ে কবি প্রেয়সীর প্রতি প্রেম নিবেদন করেছেন- ‘সখি! নতুন ঘরে গিয়ে আমায় পড়বে কি আর মনে/সেথায় তোমার নতুন পূজা নতুন আয়োজনে|’ (পিছুডাক)|
তিনি তাঁর গোপন প্রিয়া কবিতায় প্রেমের কথা ব্যক্ত করেছেন এভাবে, ’পাইনি ব’লে আজো তোমায় বাসছি ভালো, রাণী,/ মধ্যে সাগর, এ-পার ও-পার করছি কানাকানি!/ আমি এ-পার, তুমি ও-পার,/ মধ্যে কাঁদে বাধার পাথার/ ও-পার হ’তে ছায়া-তরু দাও তুমি হাতছানি,/আমি মরু, পাইনে তোমার ছায়ার ছোঁওয়াখানি|’
কবি নজরুলের লেখা প্রেমের কবিতা থেকে উদ্ধৃত করলে তাঁর প্রেমের কবিতার মর্ম বুঝতে পারা যায় | কবি-রাণী: ‘তুমি আমায় ভালোবাসো তাই তো আমি কবি|/ আমার এ রূপ-সে যে তোমায় ভালোবাসার ছবি|/ আপন জেনে হাত বাড়ালো-/ আকাশ বাতাস প্রভাত-আলো,/ বিদায়-বেলার সন্ধ্যা-তারা/ পুবের অরুণ রবি,-/তুমি ভালোবাস ব’লে ভালোবাসে সবি?’
প্রেমের পূজারী কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর অ-নামিকা কবিতায় তাঁর অনাগত প্রিয়াকে এভাবে বন্দনা করেছেন, ‘তোমারে বন্দনা করি /¯^প্ন-সহচরী /লো আমার অনাগত প্রিয়া, /আমার পাওয়ার বুকে না-পাওয়ার তৃষ্ণা-জাগানিয়া! /তোমারে বন্দনা করি/ হে আমার মানস-রঙ্গিণী, /অনন্ত-যৌবনা বালা, চিরন্তন বাসনা-সঙ্গিনী! /তোমারে বন্দনা করি /নাম-নাহি-জানা ওগো আজো-নাহি-আসা! /আমার বন্দনা লহ, লহ ভালবাসা|’
‘শেষ প্রার্থনা’ কবিতায় নজরুলের প্রেমিক হৃদয়ের এক চিরন্তন আশা-আকাঙ্খা ও আকুতি প্রকাশ পেয়েছে| প্রেমের সমস্ত দ্বন্দ্ব-বিরোধ, দুঃখ-বেদনা আর হতাশার যেন এ জনমেই সমাপ্তি ঘটে| তাইতো তিনি বলেন, ‘আজ চোখের জলে প্রার্থনা মোর শেষ বরষের শেষে/যেন এমনি কাটে আসছে জনম তোমায় ভালোবেসে|’ (শেষ প্রার্থনা)| এ যেন কেবল কোনো রোমান্টিক কবির প্রার্থনা নয়, এ যেন প্রতিটি আধুনিক নর-নারীর, যুগলজীবন যাপনকারীর প্রাণের কথা| দোলনচাঁপা কাব্যগ্রন্থের পূজারিণী কবিতায় নজরুল ভালবাসার কথা বলেছেন ভিন্ন আবহে, ‘এত দিনে অবেলায়-/প্রিয়তম !/ধূলি-অন্ধ ঘূর্ণি সম/দিবাযামী/যবে আমি/নেচে ফিরি/ধিরাক্ত মরণ-খেলায়-/এ দিনে অ-বেলায়/জানিলাম, আমি তোমা’ জন্মে জন্মে চিনি|/পূজারিণী!/ঐ কণ্ঠ, ও-কপোত- কাঁদানো রাগিণী,/ঐ আঁখি, ঐ মুখ,/ঐ ভুরু, ললাট, চিবুক,/ঐ তব অপরূপ রূপ,/ঐ তব দোলো-দোলো গতি-নৃত্য দুষ্ট দুল রাজহংসী যিনি’-/ চিনি সব চিনি|প্রেমের ক্ষেত্রে নজরুল মিলনের কবি নন; বিরহের কবি, ব্যথার কবি |
তার প্রেমিকা রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবীর মতো নিরুদ্দেশ যাত্রী নয়- সে প্রেমিকা কামনাকাঙ্খি মর্ত্যরে নায়িকা| ব্যক্তি এবং কবি হিসেবে নজরুল ছিলেন রোমান্টিক, সুন্দরের পূজারি; আর প্রেমিক নজরুলের গভীর প্রেমানুভূতির রসে টইট¤^ুর করা কাব্য দোলন-চাঁপা| এখানে দেখা যায় : নারী অধিকার করেছে তার অভিজ্ঞতা আর অভিজ্ঞানকে| বস্তুত, ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে বিদ্রোহী কবি অভিধায় সমধিক পরিচিতি লাভ করলেও, তিনি তার প্রেম সম্পর্কিত কবিতার মাধ্যমেই কাব্য-জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন| কবির কারাবাসের সুযোগে তার প্রেমিকা অন্যের হতে যাচ্ছেন এ পটভূমিতে রচিত হয় দোলন-চাঁপা| তবে দোলন-চাঁপা কাব্যের প্রেমানুভূতিই তার প্রেমের কবিতার মূল সুর| ‘দোল’ অর্থ আন্দোলিত, দোদুল্যমান| কবি প্রিয়া দোদুল্যমান, একনিষ্ট নয়; চাঁপা একপ্রকার ফুল| আসলে এ গ্রন্থের নামকরণেও কবির প্রেমিক মনের প্রতিক্রিয়া বহুলাংশে ব্যবহৃত| কাব্যগ্রন্থের নামকরণে কবি তার প্রেয়সী প্রমীলা নজরুল ওরফে দোলনের নাম ঘোষণা করেন| কবি দোলন শব্দটির সঙ্গে নিজেকে চাঁপা অর্থে কল্পনা করে শব্দ দুটিকে পাশাপাশি বসিয়ে মাঝখানে হাইফেন দিয়ে চমৎকার এক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেন| দোলন-চাঁপা কাব্যের কবিতাভিত্তিক আলোচনা করলে দেখা যায়- ‘দোদুল-দুল’ দোলন-চাঁপার প্রথম কবিতা; এখানে কবি বলেছেন- ‘সকল কাজ / করায় ভুল / প্রিয়ার মোর / কোথায় তুল?’ (দোদুল-দুল)| প্রেমিকা তার খোঁজে আঁধারে হারিয়ে গেলেও তিনি হতাশ নন; কেননা তিনি জানেন বা বিশ্বাস করেন- ‘মা গো আমি জানি জানি/আসবে আবার অভিমানী’ (অবেলার ডাক)| নজরুল নারী কিংবা প্রেয়সীকে শ্রদ্ধা করেছেন, অকপটে ¯^ীকার করেছেন ঠিকই| কিন্তু গভীর ও একনিষ্ঠ প্রেমের ক্ষেত্রে তার চিত্ত সন্দেহ, অশ্রদ্ধা এবং অনীহায় ভরে উঠেছে| তিনি নারীকে লোভী, অতিলোভী, ছলনাময়ী, মায়াময়ী ও মায়াবিনী ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করেছেন আর অবলীলায় ভর্ৎসনা করেছেন- ‘এ তুমি সে তুমিতো আজ নও/আজও হেরি তুমিও ছলনাময়ী/তুমিও হইতে চাও মিথ্যা দিয়া জয়ী|’ (পূজারিনী)|
অভিশাপ যে, বিশ্ব প্রকৃতির একটা ক্ষণিক বিদ্রোহমাত্র, তা নজরুলের কবিতায় পরিস্ফুট- ‘আমার বুকে যে কাঁটা ঘা তোমায় ব্যথা হান্ত/ সেই আঘাতই যাচবে আবার হয়তো হয়ে শান্ত/আসব তখন পান্থ|’ (অভিশাপ)| প্রেম চিরন্তন অমর এবং দীর্ঘ বিরহেই প্রেমের পরীক্ষা| তাই কবি বলেন- ‘যতই কেন বেড়াও ঘুরে/মরণ বনের গহন জুড়ে/দূর সুদূরে/কাঁদলে আমি আসবে ছুটে রইতে দূরে না রবে নাথ|’ (আশাšি^তা)| সংগ্রাম মুখর ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্যে নানা শাখায় বিশেষ করে কবিতায় ও গানে যে পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন তা বিশ্বে নজিরবিহীন| ১৯২৩ সালের ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত দোলনচাঁপা কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত দোদুল-দুল নামক প্রথম কবিতায় প্রমীলার সৌন্দর্যে বিমোহিত কবি তার সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন |
অবশেষে নজরুল-প্রমীলার বিয়ে হয় ১৯২৪ সালের এপ্রিল মাসে| প্রেম নজরুলের জীবনে এসেছিল বারবার, প্রিয়ার বিরহে হয়েছেন বেদনাভারাতুর| বুকে তোমায় নাই বা পেলাম,রইবে আমার চোখের জলে| ওগো বধূ তোমার আসন গভীর ব্যথার হিয়ার তলে|
এভাবে নজরুলের অসংখ্য কবিতায় প্রেম ও বিরহ প্রকাশ পেয়েছে নানা আঙ্গিকে নানা আবহে |






















































