ক্যাম্পাস

চবিতে দেশের প্রথম ওশান স্যাটেলাইট সেন্টার

সাবিতুল ইসলাম »

ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা উপকূলীয় দুর্যোগের তথ্য জানতে এতদিন বিদেশি সংস্থার তথ্যের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো বাংলাদেশকে। এবার সেই নির্ভরতা কমাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) চালু হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম ওশান স্যাটেলাইট ‘ওশান অবজারভেশন অ্যান্ড ডাটা ইনোভেশন সেন্টার’।

সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, এটি চালু হলে দুর্যোগের ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা আগেই পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নির্মিত অত্যাধুনিক এই সেন্টারটির অবকাঠামো নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। আগামী ৯ জুন পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা।

উদ্বোধনী আয়োজনে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত, চীনের পাঁচ সদস্যেও প্রতিনিধি দল এবং শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা।

২০২৫ সালের ২৬ মার্চ প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এটি আর্থিক সহযোগিতার কোনো প্রকল্প নয়। এর যাবতীয় ইনস্ট্রুমেন্টাল ও টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিচ্ছে চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় সমুদ্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেকেন্ড ইন্সটিটিউট অব ওশানোগ্রাফি (এসআইও)’।

প্রতিষ্ঠানটি এন্টেনা, আর্কাইভ সেন্টার, কম্পিউটার, মনিটর, গবেষণা যন্ত্রপাতিসহ যাবতীয় টেকনিক্যাল সাপোর্ট হিসেবে প্রাক্কালিন ৫০ কোটি টাকার সহযোগিতার বিষয়ে জানিয়েছিল।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ লোকাল ইনকাইন্ড সাপোর্ট হিসেবে চীন থেকে সরবরাহ করা যাবতীয় ইনস্ট্রুমেন্ট রিসিভ করা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা প্রদান, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পরিচালনা ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সহায়তা প্রদান করবে। যার প্রাক্কলিত বাজার মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই গ্রাউন্ড স্টেশন চালু হলে দেশের আবহাওয়া পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, উপকূলীয় বন্যা, বন উজাড় ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দ্রুত গবেষণা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শুধু দুর্যোগ পূর্বাভাস নয়, দেশের নীল (সমুদ্র) অর্থনীতির বিকাশেও বড় ভূমিকা রাখবে এই সেন্টার। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, স্রোতের গতি ও ক্লোরোফিল ঘনত্ব বিশ্লেষণের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য মাছ ধরার অঞ্চল নির্ধারণ করা যাবে। ফলে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্পটির সমন্বয়ক ও চবির সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘এটি আমাদের বিদেশ নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত তথ্য প্রদান নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করবে। এই ডাটা সেন্টার মূলত একটি ডাউনলিংক স্টেশন, যেখানে শুধুমাত্র তথ্য গ্রহণ করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘সেন্টারটি চালু হলে চীনের এইচওয়াই-১ সিরিজ ও এফওয়াই-৪বি স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন উৎস থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা যাবে। প্রায় ৪২০ টেরাবাইট ডেটা সংরক্ষণ সক্ষমতাসম্পন্ন এই সেন্টারটি মোট ১১টি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে প্রায় সাতটির সঙ্গে আংশিক সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে চীনের একাধিক স্যাটেলাইট থেকে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি জাপান ও নাসার স্যাটেলাইট থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর মূল লক্ষ্য বাণিজ্যিক নয়, বরং গবেষণা ও শিক্ষার প্রসার। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ জ্ঞান ও গবেষণা সৃষ্টি করা। এখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা গবেষণা করে ডাটা সংরক্ষণ করবে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক একটি সম্পদ এর ডাটা কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত থাকবে না।’

তিনি বলেন, ‘সেন্টারটি চালু হলে চীনের এইচওয়াই-১ সিরিজ ও এফওয়াই-৪বি স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন উৎস থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা যাবে। এর ফলে দুর্যোগের ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা আগেই পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হবে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

তিনি আরও জানান, ‘গবেষক ও শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত নিয়মে গবেষণা প্রস্তাব জমা দিয়ে নামমাত্র সাবস্ক্রিপশন ফি’র মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যবহার করতে পারবেন। এতে সমুদ্রবিজ্ঞান, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।’

প্রকল্পটি পরিচালনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন একটি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এখানে সিন্ডিকেট সিদ্ধান্তের একটি বিষয় আছে এবং ইউজিসি বাজেটেরও ব্যাপার আছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি যেহেতু বিরাট একটি প্রকল্প তাই এর যাবতীয় কাজ বাস্তবায়নে বিরাট পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে। গবেষণা বরাদ্দ এবং বাকি সমস্ত নিয়োগ ইউজিসির অনুমোদনের মাধ্যমে দিতে পারব। এখন আপাতত ২-৩জনকে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। জুন মাসের প্রথম দিকেই পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে। উদ্বোধনী আয়োজন বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এটিকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। সবমিলিয়ে এটির কাজ সমাপ্ত হলে দেশের ব্লু ইকোনমির জন্য বিরাট বিষয় হবে। অনেক প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানও ইতোমধ্যে ডাটা চাচ্ছে আমাদের কাছ থেকে।’

উল্লেখ্য, ‘ওশান অবজারভেশন অ্যান্ড ডাটা ইনোভেশন সেন্টার’টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্সেস আ্যন্ড ফিসারিজ অনুষদের পাশে স্থাপন করা হয়েছে।