মতামত সম্পাদকীয়

ভাঙা সড়ক ও জনভোগান্তি—সমন্বয়হীনতার দায় নেবে কে?

চট্টগ্রাম নগরের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত বিমানবন্দর সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বর্তমান বেহাল কেবল নগরবাসীর দুর্ভোগের কারণ নয়, বরং এটি সেবা সংস্থাগুলোর চরম সমন্বয়হীনতা ও দায়িত্বহীনতার এক জীবন্ত দলিলে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিমানবন্দর সড়কের এক পাশে সিটি করপোরেশন সংস্কার কাজ শেষ করলেও অন্য পাশে বৃষ্টির কারণে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এক হাতে অফিস ব্যাগ আর অন্য হাতে প্যান্ট গুটিয়ে কাদামাখা পথ পাড়ি দেওয়া একজন সাধারণ নাগরিকের চিত্রটি আসলে পুরো চট্টগ্রাম মহানগরীর বর্তমান সংকটেরই এক প্রতীকী রূপ।
বিমানবন্দর সড়কটি কেবল একটি সাধারণ রাস্তা নয়; এটি চট্টগ্রাম বন্দর, দুটি ইপিজেড, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে যাতায়াতের প্রধান পথ। এখানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ চলায় দীর্ঘদিন ধরেই রাস্তাটি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় আছে। কিন্তু বৃষ্টির অজুহাতে বা অন্য সংস্থার দোহাই দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিকে এভাবে ফেলে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন অটোরিকশাচালকের ভাষ্যমতে, সড়কটি এখন এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এটি কেবল সময়ের অপচয় নয়, বরং যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে।
দুর্ভোগের এই চিত্র কেবল বিমানবন্দর সড়কেই সীমাবদ্ধ নয়। অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়ক, বহদ্দারহাট, কল্পলোক আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে আগ্রাবাদের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সড়কের অবস্থা এখন নাজুক। বিশেষ করে ১০ বছর আগে নির্মিত অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কটি সিডিএ ও সিটি করপোরেশনের ‘বুঝে পাওয়া ও বুঝিয়ে দেওয়া’র আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সংস্কারহীন পড়ে থাকা একটি হাস্যকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন ওঠে, সরকারি দুই সংস্থার রশি টানাটানির খেসারত কেন সাধারণ নাগরিকেরা দেবেন? উন্নয়ন যদি মানুষের স্বস্তির পরিবর্তে দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তির কারণ হয়, তবে সেই উন্নয়নের সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে নগরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের খোঁড়াখুঁড়ি ও খাল থেকে তোলা মাটি। চাক্তাই খাল বা প্রবর্তক মোড়ের নালা পরিষ্কারের মাটি বৃষ্টিতে ধুয়ে ফের সড়কেই মিশে যাচ্ছে। এতে পুরো সড়ক কর্দমাক্ত হয়ে যানবাহন ও পথচারী চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। সিডিএ, ওয়াসা আর সিটি করপোরেশনের এই যে ‘নিজেদের দায় এড়ানোর সংস্কৃতি’, তা নগরবাসীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী চলতি মাসে আরও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এখনই ব্যবস্থা না নিলে জলাবদ্ধতা ও ভাঙা সড়কের কারণে চট্টগ্রাম এক অচল নগরীতে পরিণত হতে পারে।
আমরা মনে করি, কেবল বিটুমিনের প্রলেপ দিয়ে সড়কের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নগর পরিকল্পনাবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী, জলাবদ্ধপ্রবণ এলাকাগুলোতে অবিলম্বে কংক্রিটের টেকসই সড়ক নির্মাণে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে তার চেয়েও জরুরি হলো সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। মেয়র এবং উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে একই টেবিলে বসে কাদা-ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অবিলম্বে বিমানবন্দর সড়কসহ নগরের ক্ষতিগ্রস্ত প্রধান সড়কগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের উদ্যোগ নিতে হবে। উন্নয়ন কাজের জন্য খোঁড়া মাটি দ্রুত অপসারণ নিশ্চিত করা এবং সংস্থাগুলোর মধ্যকার রশি টানাটানি বন্ধ করে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সড়ক সংস্কারের কাজ শেষ করার জোর দাবি জানাচ্ছি আমরা। চট্টগ্রামবাসীর ধৈর্য যেন প্রশাসনের অযোগ্যতার সুযোগ না হয়ে দাঁড়ায়—কর্তৃপক্ষকে সেটি মনে রাখতে হবে।