মতামত সম্পাদকীয়

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এ প্রক্রিয়া ঝুলে আছে কেন

চট্টগ্রাম নগরে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। পাহাড়সম এই বর্জ্য আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার জন্য যেখানে অভিশাপ, সেখানে উন্নত বিশ্বে এটি জ্বালানির অন্যতম প্রধান উৎস। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, গত এক দশকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দেশি-বিদেশি অন্তত ২০টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিলেও আলোর মুখ দেখেনি একটিও। সম্প্রতি জাপানি প্রতিষ্ঠান জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ১২-১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। এটাও ঝুলে যাবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।
পত্রিকায় প্রকাশিত চসিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে চীন, যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবের মতো দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ৩৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা যাচাই করেছে। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ভূমির সংকট কিংবা অসম্পূর্ণ সমীক্ষার অজুহাতে প্রকল্পগুলো থমকে গেছে। এক হাজার টন বর্জ্য ব্যবহার করে যদি ১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব হয়, তবে তা কেবল জ্বালানি সংকট মেটাবে না, বরং ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ কমিয়ে ফেলবে। এতে নগরের পরিবেশ দূষণ ও কর্ণফুলী নদীর স্বাস্থ্য রক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারত।
এই ব্যর্থতার মূলে রয়েছে সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ অত্যন্ত যৌক্তিক—এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের (স্থানীয় সরকার ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়) এখতিয়ারাধীন, তাই অনুমোদনের প্রক্রিয়াটি দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়। আবার পরিবেশ দূষণের শঙ্কা দেখিয়ে অনেক সময় প্রস্তাব নাকচ করা হয়, অথচ আধুনিক ‘ইনসিনারেশন’ বা বর্জ্য পোড়ানো প্রযুক্তিতে পরিবেশের ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণের চেয়ে সনাতন পদ্ধতিতে বর্জ্য ফেলে রাখাকেই যেন শ্রেয় মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
চসিক কর্মকর্তাদের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠান পূর্ণাঙ্গ ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ জমা দেয়নি। তবে প্রশ্ন জাগে, এক দশকে ২০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কি একটিও নির্ভরযোগ্য ছিল না? নাকি আমাদের পক্ষ থেকে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য ও জমির সংস্থান দিতে গাফিলতি ছিল? চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সবার আগে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন জরুরি। উৎসস্থলেই বর্জ্য পৃথকীকরণ না করলে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের কার্যকারিতা কমে যায়।
এখন সময় এসেছে গতানুগতিক ফাইলের আদান-প্রদান বন্ধ করে কার্যকরী পদক্ষেপে যাওয়ার। সরকারের উচিত একটি ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ বা আন্তঃমন্ত্রণালয় সেল গঠন করা, যা এই ধরনের সবুজ জ্বালানি প্রকল্পের অনুমোদন দ্রুত নিশ্চিত করবে। জাপানি প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক প্রস্তাবটিকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে একটি পাইলট প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে।
বর্জ্য আমাদের জন্য কোনো আবর্জনা নয়, বরং একটি সম্পদ। যদি ২০টি প্রস্তাবের একটিও বাস্তবায়ন করা না যায়, তবে তা কেবল প্রশাসনিক অযোগ্যতা হিসেবেই গণ্য হবে। চট্টগ্রামের পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্পগুলোকে আমলাতান্ত্রিক বেড়াজাল থেকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। সদিচ্ছা থাকলে বর্জ্যের স্তূপই হতে পারে আলোর উৎস।