মতামত সম্পাদকীয়

হামের উচ্চ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ : আমাদের প্রস্তুতি কী

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশকে হামের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এই সতর্কতা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি জরুরি বিপদসংকেত। এক সময় যে দেশ টিকাদানে অভাবনীয় সাফল্যের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল, সেখানে সংক্রামক ব্যাধি হামের পুনরাগমন ও উচ্চ ঝুঁকি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো জনপদে হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে হলে অন্তত ৯৫% শিশুকে টিকার আওতায় আনা জরুরি। কিন্তু করোনা মহামারীর সময় বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার যে ঢেউ উঠেছিল, তার প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। লকডাউন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে মানুষের ভীতি এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে কিছুটা শিথিলতার কারণে অনেক শিশু প্রয়োজনীয় ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসন এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে এলাকায় বস্তিবাসী শিশুদের সঠিক পরিসংখ্যানের অভাব টিকাদান কর্মসূচিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর মতো উচ্চ ঘনত্বের এলাকাগুলোতে সংক্রমণের হার বাড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
অনেকেই হামকে সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ি মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সময়মতো চিকিৎসা ও টিকা না পেলে হাম থেকে নিউমোনিয়া, মস্তিস্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), অন্ধত্ব এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য এই ভাইরাস প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। যেখানে একটি শিশুও টিকার বাইরে থাকে, সেখানে পুরো কমিউনিটি ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। তবে কেবল পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। মাঠ পর্যায়ে ‘ড্রপআউট’ বা বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রথম ডোজ নিলেও সচেতনতার অভাবে দ্বিতীয় ডোজটি আর নেয়া হয় না। অথচ পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষার জন্য দুটি ডোজই অপরিহার্য।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় হামের ভয়াবহতা এবং টিকার গুরুত্ব নিয়ে প্রচারণা জোরদার করতে হবে।
টিকাদান নিয়ে গ্রামীণ বা প্রান্তিক পর্যায়ে কোনো ভ্রান্ত ধারণা থাকলে তা নিরসনে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের টিকাদান কার্ড পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। যারা নিয়মিত টিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের জন্য বিশেষ ‘ক্যাচ-আপ’ কর্মসূচির মাধ্যমে দ্রুত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
হাম নির্মূল করা অসম্ভব কিছু নয়, যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক সচেতনতা হাত ধরাধরি করে চলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই সতর্কবার্তা আমাদের জন্য এক সতর্কবাণী—যাতে আমরা আত্মতুষ্টিতে না ভুগে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি পঙ্গুত্বমুক্ত ও নিরাপদ পৃথিবী উপহার দিতে সঠিক সময়ে টিকাদানের কোনো বিকল্প নেই।