স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী সামনে রেখে

228

সাধন সরকার »

‘স্বাধীনতা’ শুধু একটি শব্দ নয়, এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। স্বাধীনতা মানে সত্য ও সুন্দরের পথে চলা। চিন্তা ও মত প্রকাশে স্বাধীন, অনিয়মের বিরুদ্ধে শুভবোধ জাগ্রত করার অধিকার, সর্বদা ভালো কাজ করা ও ভালো কাজ করতে দেওয়ার অধিকারই স্বাধীনতা। সময়, স্থান ও ক্ষেত্রবিশেষে স্বাধীনতা শব্দটি বিশেষ বিশেষ অর্থ বহন করে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার অর্থ আর স্বাধীন দেশে তথা বর্তমান সময়ে স্বাধীনতার অর্থের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। একজন নারীর কাছে স্বাধীনতা হলো পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি থেকে মুক্তি। একজন কৃষকের কাছে স্বাধীনতা হলো ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া। বাস্তবতার জাঁতাকলে পিষ্ট বাল্যবিবাহের শিকার হওয়া একজন নারীর কাছে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা অনেক বেশি অর্থবহুল।
ভোটের দিন একজন নাগরিকের কাছে অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন পথশিশুর পড়ালেখার অধিকার বা স্বাধীনতা তার কাছে সবচেয়ে দামি। শেয়ারবাজারে কারবার করা একজন বিনিয়োগকারী অবশ্যই এ স্বাধীনতা পাওয়ার অধিকার রাখে যে, হঠাৎ করে সে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবে না। একজন দুধ বিক্রেতা দুধের ন্যায্য দাম পাওয়ার অধিকার রাখে। একজন নারী তার পোশাকের কারণে রাস্তাঘাটে কটু কথা বা নেতিবাচক আচরণের শিকার হবে না- এটা নারীর অধিকার।
পড়ালেখা শেষ করা একজন তরুণ চাকরি করতে এসে ঘুষ-দুর্নীতি-হয়রানির শিকার হবে না- এটা একজন তরুণের অধিকার। হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজতে থাকা একজন বেকার যুবকের অবশ্যই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য তথা উদ্যোক্তা বা ভিন্ন কিছু হওয়ার জন্য রাষ্ট্র থেকে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা বলে, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য বেকার তরুণদের পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। একজন স্বাধীন নাগরিককে অন্যের অপকর্মের দায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে হয়রানি না হওয়ার অর্থ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। হাসপাতালে সেবা নিতে এসে চিকিৎসা শেষে বিলের নামে গরিব রোগীর ‘গলাকাটা’ হবে নাÑস্বাধীন দেশে এমন স্বাধীনতা ভোগ করার অধিকার গরিব জনগণের রয়েছে।
জীবনে স্বাধীনতা যেমন দরকার আছে, তেমনি স্বাধীনতার মান রক্ষা করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা মানে স্বেচ্ছাচারিতা নয়, স্বাধীনতা হলো নিজের বিবেক আর সুইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। স্বাধীনতা মানে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। স্বাধীনতা মানে অন্যের উপকারে আসা, অপরের প্রতি মার্জিত ও রুচিশীল ব্যবহার। স্বাধীনতা মানে ক্ষমতা বলে অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়া নয়। স্বাধীনতা মানে গরিব, প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ন্যায্য অধিকারের কথা বলা। যুক্তির আলোয় মুক্তির সন্ধান করা মানুষদের নিজের মতামত প্রকাশ বা চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করার নাম স্বাধীনতা নয়।
স্বাধীনতা মানে স্বাধীন চেতনায় বাস করা। অন্যের মতামত বা ভিন্নমত দমন করা নয়, স্বাধীনতা মানে অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
স্বাধীনতা মানে ধর্মকে ব্যবহার করে ফায়দা লুটা নয়, স্বাধীনতা মানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চাপ প্রয়োগ নয়, স্বাধীনতা মানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার। দুই-তিন দশক আগেও একটি রাষ্ট্রে যে অনিয়ম, দুর্নীতি, অপকর্ম, ভিন্নমত দমন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, গুম ও ক্ষমতার অপব্যবহার হতো দুই-তিন দশক পরেও যদি একইভাবে বা ভিন্নভাবে ওইসব অব্যবস্থাপনা চলতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে হবে স্বাধীনতার অর্থ জনগণের কাছে পৌঁছায়নি। একজন বয়স্ক ব্যক্তির বয়স্ক ভাতার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরার নাম স্বাধীনতা নয়। স্বাধীনতা হলো রাষ্ট্র প্রদত্ত অধিকার সঠিকভাবে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া।
স্বাধীনতা মানে পরাধীনতার শিকলে বন্দী থাকা নয়, স্বাধীনতা মানে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া। একজন বেকার তরুণ যদি চাকরি না পেয়ে, পরিবারের আশা পূরণ করতে না পেরে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়ে আত্মহত্যার মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় তাহলে বুঝতে হবে পরিপূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ সবার জন্য সমান হয়ে ওঠেনি। স্বাধীনতা মানে বেকার তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। স্বাধীনতা মানে দলীয়করণ নয়, পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে জনগণকে বোকা বানানো নয়। স্বাধীনতা মানে নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করা। স্বাধীনতা মানে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটানো। স্বাধীনতা মানে শিক্ষার সাথে বাস্তবের সম্মিলন ঘটানো। স্বাধীনতা মানে একই রাষ্ট্রে একই ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার ভোগ করা। স্বাধীনতা মানে সুশাসন। স্বাধীনতা মানে দেশের ঊর্ধ্বে রাজনীতি নয়, রাজনীতির ঊর্ধ্বে দেশ।
লেখক : কলামিস্ট ও পরিবেশকর্মী
ংধফড়হংধৎশবৎ২০০৫@মসধরষ.পড়স