আজ ২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী ♦ তাঁর প্রতি অতল শ্রদ্ধা
সনেট দেব »
২৫শে ˆবশাখ, ১২৬৮ বঙ্গাব্দ| জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্ম নিলেন এক শিশু— যাঁর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর| কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সংগীতস্রষ্টা, চিত্রশিল্পী, দার্শনিক— এক মানুষের মধ্যে যেন কত শত মানুষ বাস করতেন| আজ তাঁর জন্মের একশো পয়ষট্টি বছর পেরিয়ে গেছে| পৃথিবী বদলে গেছে আমূল| বাষ্পীয় ইঞ্জিনের জায়গায় এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা| চিঠির জায়গায় এসেছে তাৎক্ষণিক বার্তা| মানুষ এখন চাঁদে পা দিয়েছে, মঙ্গলে বসতি গড়ার ¯^প্ন দেখছে| তবু রবীন্দ্রনাথ থেকে গেছেন— অটল, অম্লান, অপরিহার্য| প্রশ্ন জাগে— কেন? একজন মানুষ, যিনি এই পৃথিবী ছেড়ে গেছেন ১৯৪১ সালে, তিনি আজও কেন এত জীবন্ত? কেন তাঁর কথা আজও আমাদের বুকে বাজে? কেন সকালবেলা ঘুম ভেঙে কেউ তাঁর গান গুনগুন করে? কেন বিরহে কাতর একজন তরুণ তাঁর কবিতার পাতা ওল্টায়? কেন রাষ্ট্রনায়করা তাঁর উক্তি উদ্ধৃত করেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির গভীরে ডুব দিতে হবে|
রবীন্দ্রনাথের সমস্ত সৃষ্টির মূলে আছে একটাই সুর— মানুষ| শুধু মানুষ| তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরকে খুঁজতে হলে মানুষের মধ্যেই খুঁজতে হবে| মন্দির-মসজিদ-গির্জার বাইরে, ধর্মগ্রন্থের পাতার বাইরে— সত্যিকারের ঈশ্বর বাস করেন মানুষের হৃদয়ে, মানুষের সেবায়| এই দর্শনই তাঁকে করে তুলেছিল এক অনন্য মানবতাবাদী| তাঁর বিখ্যাত উক্তি— ুমানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ” — আজকের দুনিয়ায় কতটা প্রাসঙ্গিক, তা একটু ভাবলেই বোঝা যায়| আমরা এমন একটি সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষে মানুষে বিভেদ বাড়ছে প্রতিনিয়ত| ধর্মের নামে, জাতির নামে, গোষ্ঠীর নামে, রাজনীতির নামে মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়ছে| ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিটি কোণে| ঠিক এই মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী দর্শন হয়ে ওঠে এক অসাধারণ প্রতিষেধক| তিনি সারাজীবন সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন| প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন সারা বিশ্ব জাতীয়তাবাদের নেশায় মত্ত, তখন তিনি সাহসের সঙ্গে বললেন— এই সংকীর্ণতা মানুষকে ছোট করে, মানুষকে পশুতে পরিণত করে| তিনি চেয়েছিলেন এক বৃহত্তর মানবিক পরিচয়, যেখানে মানুষ শুধু কোনো দেশ বা ধর্মের নয় সমগ্র পৃথিবীর|
রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে শুধু পটভূমি হিসেবে দেখেননি| তিনি প্রকৃতিকে দেখেছেন এক জীবন্ত সত্তা হিসেবে, যার সঙ্গে মানুষের আত্মার গভীর, অচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে| তাঁর কাছে ঝরনার কলকল শব্দ, বর্ষার মেঘের গর্জন, শরতের নীল আকাশ— এগুলো কেবল প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এগুলো মানবহৃদয়ের সঙ্গে কথা বলে| পদ্মার তীরে বোটে বসে রবীন্দ্রনাথ যখন লিখতেন, তখন নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে তাঁর চিন্তাও ঢেউ খেলত| বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য তাঁর লেখায় এসেছে অপূর্বভাবে| বর্ষা তাঁর কাছে শুধু বৃষ্টি নয়, এটি বিরহের প্রতীক, মিলনের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ| শরৎ মানে শুধু কাশফুল নয়, এটি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত|
আজ যখন জলবায়ু পরিবর্তন, বনউজাড়, নদীদূষণ নিয়ে সারাবিশ্ব উদ্বিগ্ন, তখন রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিপ্রেম একটি নতুন অর্থ পায়| তিনি বহু আগেই বলে গেছেন, প্রকৃতিকে ধ্বংস করা মানে নিজেকেই ধ্বংস করা| মানুষ প্রকৃতির অংশ— প্রকৃতির মালিক নয়| এই দর্শন আজকের পরিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে কতটা মিলে যায়! শান্তিনিকেতনে তিনি গাছের ছায়ায় পাঠদানের ব্যবস্থা করেছিলেন| শিক্ষার্থীরা যেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠে, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে শেখে | এটি ছিল তাঁর গভীর বিশ্বাস| আজকের কংক্রিটের শহরে বড় হওয়া শিশুরা যখন প্রকৃতি থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, তখন রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনা আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়ে|
শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, তা ছিল তৎকালীন প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত| ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শিক্ষা তখন মানুষকে ˆতরি করত কেরানি হওয়ার জন্য— মুখস্থ করো, পরীক্ষা দাও, চাকরি পাও| রবীন্দ্রনাথ এই ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করলেন| তিনি বললেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল তথ্য মুখস্থ করা নয়— শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মানুষের ভেতরের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা| একটি শিশু যেন তার নিজের মতো করে চিন্তা করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, সৃষ্টি করতে পারে— এটাই ছিল তাঁর শিক্ষার মূল লক্ষ্য|
তিনি বিশ্বাস করতেন, আনন্দহীন শিক্ষা প্রকৃত শিক্ষা নয়| শিশুরা যদি ভয়ে ভয়ে পড়াশোনা করে, পরীক্ষার চাপে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয় তাহলে সেই শিক্ষা তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না| শান্তিনিকেতনে তাই ছিল খোলা আকাশের নিচে পাঠ, সংগীত-চিত্রকলা-নৃত্যের সমš^য়, শিক্ষার্থীর ¯^াধীন বিকাশের সুযোগ| আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে যত বিতর্ক — পরীক্ষানির্ভর মূল্যায়ন, সৃজনশীলতার অভাব, শিক্ষার্থীদের অসহনীয় মানসিক চাপ, কোচিং-নির্ভরতা— এই সমস্যাগুলোর সমাধানসূত্র রবীন্দ্রনাথ বহু আগেই দিয়ে গেছেন| আমরা যদি তাঁর শিক্ষাদর্শন একটু মনোযোগ দিয়ে পড়তাম, তাহলে হয়তো শিক্ষাব্যবস্থার এত সংকট ˆতরি হতো না|
রবীন্দ্রনাথের প্রেমের কবিতা ও গান আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে এবং এটি কোনো কাকতাল নয়| কারণ প্রেম চিরন্তন| যুগ বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, যোগাযোগের মাধ্যম বদলায় কিন্তু মানুষের হৃদয়ের ভাষা বদলায় না| ভালোবাসার আনন্দ, বিরহের যন্ত্রণা, প্রতীক্ষার কষ্ট — এগুলো একশো বছর আগেও যেমন ছিল, আজও তেমনই আছে| রবীন্দ্রনাথ প্রেমকে দেখেছিলেন এক বহুমাত্রিক অনুভূতি হিসেবে| তাঁর প্রেমের কবিতায় আছে কামনা, আছে আধ্যাত্মিকতা, আছে বিরহ, আছে মিলনের আকাঙ্ক্ষা| মানুষের প্রেমকে তিনি ঈশ্বরের প্রেমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন| এই গভীরতাই তাঁর প্রেমের গান ও কবিতাকে করেছে অমর| একটি তরুণ যখন প্রথমবার ভালোবাসে, যখন প্রথমবার বিরহ অনুভব করে, সে রবীন্দ্রনাথের কাছে ছুটে যায়| কারণ রবীন্দ্রনাথ যেন তার মনের অব্যক্ত কথাটুকুই বলে দেন| যে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যাচ্ছিল না, রবীন্দ্রনাথের কলম সেটা অনায়াসে প্রকাশ করে দেয়| এটাই তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা|
বাংলাদেশের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক কেবল সাহিত্যিক নয়- এটি আত্মিক, ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিকও বটে| আমাদের জাতীয় সংগীত ুআমার সোনার বাংলা” তাঁরই লেখা| এই গানটি শুধু একটি সংগীত নয়— এটি একটি জাতির আত্মার ঘোষণা| রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মাটিতে বহুবার এসেছেন| পদ্মার বুকে ভেসে বেড়িয়েছেন| শিলাইদহ, শাহজাদপুর, পতিসরে কাটিয়েছেন দীর্ঘ সময়| এই ভূমির মানুষ, এই নদীর জল, এই আকাশের রং তাঁর লেখায় ঢেলে দিয়েছেন তিনি| বাংলাদেশের প্রকৃতি ও মানুষ তাঁর অনেক শ্রেষ্ঠ রচনার অনুপ্রেরণা|
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এক অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী উপস্থিতি| পাকিস্তানি শাসকরা যখন রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল কারণ তারা বুঝেছিল রবীন্দ্রনাথ মানেই বাঙালির ¯^তন্ত্র পরিচয় — তখন বাংলার মানুষ আরও জোরে, আরও সাহসের সঙ্গে আঁকড়ে ধরেছিল তাঁকে| রবীন্দ্রনাথ তখন হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির পরিচয়ের প্রতীক, সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের হাতিয়ার| ¯^াধীনতার পরেও রবীন্দ্রনাথ আমাদের জাতীয় জীবনে গভীরভাবে প্রোথিত| বাংলা নববর্ষ উদযাপন থেকে শুরু করে বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান — সর্বত্র রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা, নাটক আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছে|
অনেকে বলেন, তরুণরা রবীন্দ্রনাথ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে| কিন্তু এই কথা পুরোপুরি সত্য নয়, বরং বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ধরনটা বদলে গেছে| তারা হয়তো পুরো রবীন্দ্রসমগ্রের পাতায় পাতায় ডুব দিচ্ছে না কিন্তু তারা রবীন্দ্রনাথকে বুকের কাছে রেখেছে নিজেদের মতো করে| সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিদিন হাজারো পোস্টে রবীন্দ্রনাথের উক্তি, গান, কবিতার লাইন শেয়ার হচ্ছে| ইউটিউবে রবীন্দ্রসংগীতের কোটি কোটি ভিউ হচ্ছে| নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা রবীন্দ্রসংগীতকে নতুন সুরে, নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করছেন এবং তরুণরা সেটা গ্রহণ করছেন উৎসাহের সঙ্গে|
রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক, কারণ মানুষ প্রাসঙ্গিক| তাঁর প্রতিটি লেখা আসলে মানুষের কথা, মানুষের আনন্দ, মানুষের বেদনা, মানুষের ¯^প্ন, মানুষের সংঘাত| যতদিন মানুষ ভালোবাসবে, কাঁদবে, প্রশ্ন করবে, ¯^প্ন দেখবে — ততদিন রবীন্দ্রনাথ থাকবেন| তিনি কোনো একটি যুগের নন, তিনি সব যুগের| কোনো একটি দেশের নন, তিনি সব দেশের| কোনো একটি ধর্মের নন, তিনি সব ধর্মের মানুষের| তাঁর জন্মদিনে তাই শুধু ফুল দিয়ে নয়, তাঁর কথাগুলো মনে রেখে, তাঁর দর্শন বুকে ধারণ করে শ্রদ্ধা জানানোই হবে সবচেয়ে সুন্দর উপহার|





















































