এম আব্দুল হালীম বাচ্চু »
গ্রামের একদম শেষ প্রান্তে, কাচা রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট টিনের ঘর| ঘরটার সামনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো কদমগাছ আর আগুনরঙা ফুলেভরা পলাশগাছ দুটি যেন ঋতুর বুক থেকে গল্প কুড়িয়ে রাখত| সেই ঘরেই থাকত এম বারী বচ্চন, সবাই ডাকত শুধু বচ্চন নামে| তার মা আইভি লতা, আর ছোট বোন নাহার| সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু বচ্চনের মনে ছিল এক অদ্ভুত ¯^প্ন একদিন সে মেঘের ওপারে একটা বাড়ি বানাবে, যেখানে কোনও কষ্ট থাকবে না|
পাশের বাড়িতে থাকত মণিকা| বিকেল হলেই সে কদম আর পলাশের ছায়ায় এসে বসত| হাতে বই, চুলে বাতাস, আর চোখে এক নীরব নদী| বচ্চন দূর থেকে তাকিয়ে থাকত| কিছু বলতে পারত না| শুধু মনে হতো, মণিকার হাসি শুনলে পৃথিবীর সব বৃষ্টি থেমে যায়|
বচ্চনের একমাত্র বন্ধু ছিল সাখাওয়াৎ| ˆশশব থেকে একসঙ্গে বড়ো হওয়া| সাখাওয়াৎ ছিল তার বুকের ভেতর জমে থাকা সব কথার সাক্ষী|
একদিন পলাশগাছের নিচে বসে সাখাওয়াৎ বলল,
তুই ওকে ভালোবাসিস, তাই না?
বচ্চন মেঘের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
ভালোবাসা কি মুখে বলতে হয়?
সাখাওয়াৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
না বললে কখনো কখনো মানুষ হারিয়ে যায়|
বচ্চন কিছু বলল না| কদমফুলের গন্ধে সন্ধ্যা নেমে আসছিল|
একদিন বিকেলে মণিকা এসে বলল,
তুমি সবসময় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকো কেন?
বচ্চন বলল, ওপারে আমার একটা বাড়ি আছে|
মণিকা অবাক হয়ে হেসে বলল,
মেঘের ওপারে আবার বাড়ি হয় নাকি?
যারা খুব কষ্ট পায়, তারা বানায়|
মণিকা সেদিন আর কিছু বলেনি| শুধু তাকিয়ে ছিল| যেন প্রথমবার বুঝেছিল, এই ছেলেটার ভেতরে অনেক ঝড় লুকিয়ে আছে| তারপর থেকে মণিকা প্রায়ই আসত| নাহারের জন্য বই আনত, আইভি লতার সঙ্গে রান্নাঘরে গল্প করত| ঘরটায় যেন আলো ঢুকে পড়েছিল| আইভি লতা বলতেন, মেয়েটা এলে এই ঘরটা বেঁচে ওঠে|
বচ্চনের বুকের ভেতর জমে উঠত অদ্ভুত এক সুখ| কিন্তু সে কখনো বলেনি, “আমি তোমাকে ভালোবাসি|” হঠাৎ একদিন খবর এল মণিকার বিয়ে ঠিক হয়েছে শহরের এক স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে| সবকিছু খুব দ্রুত| বচ্চনের পৃথিবী যেন হঠাৎ থেমে গেল|
সেই রাতে কদম আর পলাশগাছের মাঝখানে বসে ছিল সে| সাখাওয়াৎ পাশে এসে বলল, এখনও সময় আছে| গিয়ে বলে আয়|
বচ্চন মাথা নাড়ল| যে পাখি উড়তে চায়, তাকে ধরে রাখা পাপ|
পরদিন মণিকা এলো| হাতে একটি ছোট কাঠের বাক্স|
এটা রাখো|
বচ্চন খুলে দেখল ভেতরে শুকনো কদমফুল, একটি পলাশের লাল পাপড়ি, আর একটি কাগজ|
তাতে লেখা, “তোমার মেঘের ওপারের বাড়িতে যদি জানালা থাকে, তাহলে আমাকে দেখো মাঝে মাঝে|”
বচ্চনের গলা কেঁপে উঠল, তুমি চলে যাবে?
মণিকা চোখ নামিয়ে বলল,
সবাই নিজের ইচ্ছেমতো থাকতে পারে না|
দূরে দাঁড়িয়ে সাখাওয়াৎ দেখছিল| তার মনে হচ্ছিল, এই বিকেলটা একদিন গল্প হয়ে থাকবে|
বিয়ের দিন আকাশে কালো মেঘ| মণিকার গাড়ি ধুলো তুলে দূরে মিলিয়ে গেল| বচ্চন দাঁড়িয়ে ছিল কদম আর পলাশের ছায়ায়| মনে হচ্ছিল, কেউ তার মেঘের ওপারের দরজাটা বন্ধ করে দিলো|
বছর কেটে গেল|
বচ্চন শহরে চাকরি নিলো| আইভি লতাকে নিয়ে নতুন ঘর বানালো| নাহার কলেজে উঠল| জীবন একটু ¯^স্তি পেলো| তবু কদমফুল বা পলাশের আগুনরঙা পাপড়ি দেখলেই বুকের ভেতর পুরনো ব্যথা জেগে উঠত|
এক বর্ষার দুপুরে সে গ্রামে ফিরল| কদম আর পলাশগাছ এখনও পাশাপাশি দাঁড়িয়ে| গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ডাকপিয়ন একটা পুরনো খাম দিলো|
খাম খুলে বচ্চন দেখল, একটি চিঠি|
“বচ্চন, আমার জানালা আজও খোলা| তোমার মেঘের ওপারের বাড়ি কি এখনো আছে? আমি প্রতিদিন বৃষ্টির শব্দে তার ঠিকানা খুঁজি|”
চিঠির কালি ঝাপসা| যেন কারও চোখের জল শুকিয়ে আছে|
বচ্চন বাক্সটা খুলল| শুকনো কদমফুল, পলাশের লাল পাপড়ি সব আগের মতোই আছে| সাখাওয়াৎ এসে পাশে দাঁড়াল| এতবছর পরও বন্ধুর নীরবতা সে চিনতে পারে|
আইভি লতা বারান্দা থেকে ডাকলেন,
কী দেখিস এত?
বচ্চন আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
বাড়ি|
কোথায়?
সে ধীরে বলল, মেঘের ওপারে| যেখানে হারিয়ে যাওয়া মানুষও একদিন ফিরে আসে|
বৃষ্টি নেমে এলো| কদম আর পলাশের নিচে দাঁড়িয়ে বচ্চন বুঝল কিছু ভালোবাসা কখনো কাছে আসে না, তবু সারাজীবন হৃদয়ের আকাশে মেঘ হয়ে ভাসে|






















































