সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে মানুষের উদ্বেগ, আলোচনা ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করলে প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের একটি কাল্পনিক মন্তব্য মনে পড়ে| টাকা নিয়ে মানুষের এই উন্মাদনা দেখে তিনি হয়তো বলতেন, “এই যে কাগজটা দেখছো, এটা আসলে একটা মায়া| এ মায়া বড় অদ্ভুত মায়া, অন্য সকল মায়াকে নষ্ট করে দেয়|”
দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে নগদ অর্থের সংকট, এটিএম বুথে টাকা না থাকা কিংবা ডিজিটাল লেনদেনে সাময়িক জটিলতার খবর শুনে অনেকের মনে ধারণা ˆতরি হয়েছে—হয়তো দেশের টাকা কোথাও উধাও হয়ে যাচ্ছে| কেউ কেউ মনে করছেন, ব্যাংকে জমা রাখা অর্থ আর নিরাপদ নয়| কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, টাকা কোথাও হারিয়ে যায়নি| বরং অর্থের বড় অংশ এখন কাগজের নোট নয়, ব্যাংকের ডাটাবেজে ডিজিটাল সংখ্যারূপে সংরক্ষিত রয়েছে|
আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে বুঝতে হলে প্রথমেই একটি প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করতে হবে| অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, ব্যাংকে জমা দেওয়া অর্থ তাদের নামে কোনো ভল্টে সংরক্ষিত থাকে| কিন্তু ব্যাংকিং ব্যবস্থার কার্যপ্রণালি সম্পূর্ণ ভিন্ন|
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি ৫০ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা দিলেন| ব্যাংক সেই টাকা পুরোপুরি ভল্টে আটকে রাখে না| কারণ ব্যাংক জানে, সব আমানতকারী একসঙ্গে তাদের অর্থ উত্তোলন করতে আসবেন না| তাই ব্যাংক একটি অংশ রিজার্ভ হিসেবে রেখে বাকিটা ঋণ ও বিনিয়োগ হিসেবে অর্থনীতিতে প্রবাহিত করে| এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়, শিল্পকারখানা গড়ে ওঠে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়|
অর্থনীতিতে এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং’| অর্থাৎ, আমানতের একটি অংশ নগদ রিজার্ভ হিসেবে রেখে বাকি অংশ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হয়| এভাবেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন হিসেবে কাজ করে|
একই সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন অর্থও সৃষ্টি হয়| উদাহরণ¯^রূপ, একজনের জমাকৃত অর্থ অন্য একজন ঋণ হিসেবে ব্যবহার করেন, পরে সেই অর্থ আবার অন্য কোনো ব্যাংকে আমানত হিসেবে জমা পড়ে| ফলে একই মূলধন অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে নতুন আর্থিক কার্যক্রম সৃষ্টি করে| অর্থনীতিবিদরা একে বলেন ‘মানি ক্রিয়েশন’ বা অর্থ সৃষ্টির প্রক্রিয়া|
তবে এই ব্যবস্থার ঝুঁকিও রয়েছে| যখন ঋণ উৎপাদনশীল খাতের পরিবর্তে জমি, শেয়ার বা কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের অ¯^াভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যাশায় বিনিয়োগ হতে শুরু করে, তখন সৃষ্টি হয় ‘অ্যাসেট বাবল’| কৃত্রিম চাহিদার কারণে সম্পদের দাম বাস্তব মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে যায়| কিন্তু একসময় বাস্তবতা সামনে এলে সেই বুদবুদ ফেটে যায় এবং ঋণগ্রহীতারা বিপাকে পড়েন| এর প্রভাব পড়ে ব্যাংকিং খাতেও|
তবে কোনো ব্যাংকের কিছু ঋণ সময়মতো আদায় না হওয়া কিংবা সাময়িক নগদ অর্থের চাপ ˆতরি হওয়া মানেই সেই ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে—এমন ধারণা সঠিক নয়| বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য| কারণ কোনো ব্যাংকের কাছেই তার সব আমানতকারীর অর্থ একসঙ্গে নগদে পরিশোধ করার মতো টাকা থাকে না| ব্যাংকের অর্থ বাজারে বিনিয়োগকৃত অবস্থায় থাকে|
সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন বাস্তব সংকটের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে গুজব ও আতঙ্ক| সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব, ফেসবুক লাইভ কিংবা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনেক সময় মানুষের মধ্যে অযৌক্তিক ভয় ˆতরি করে| একটি ব্যাংক নিয়ে নেতিবাচক গুজব ছড়িয়ে পড়লে গ্রাহকেরা হুমড়ি খেয়ে টাকা তুলতে শুরু করেন| অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘ব্যাংক রান’|
ইতিহাস সাক্ষী, বহু ব্যাংক প্রকৃত আর্থিক দুর্বলতার কারণে নয়, বরং গ্রাহকদের সমষ্টিগত আতঙ্কের কারণে বড় সংকটে পড়েছে| যখন হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে তাদের অর্থ উত্তোলন করতে চান, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাংকও সাময়িক চাপের মুখে পড়ে|
এই আতঙ্কের আরেকটি নেতিবাচক দিক রয়েছে| মানুষ যখন ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে ঘরে জমা করে রাখে, তখন সেই অর্থ অর্থনীতির উৎপাদনশীল চক্র থেকে বেরিয়ে যায়| ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঋণ পায় না, নতুন বিনিয়োগ কমে যায়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়| শেষ পর্যন্ত এই ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকেই|
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে যে কোনো সমস্যা নেই, এমন দাবি করার সুযোগ নেই| খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রক দুর্বলতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে| কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠানের সমস্যা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার পতনের পূর্বাভাস নয়| সংকট দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সরকার বিভিন্ন নীতিগত ও আর্থিক পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে| বিশ্বের প্রায় সব দেশেই এ ধরনের ব্যবস্থা বিদ্যমান|
সবশেষে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা জরুরি—টাকা আসলে কাগজ নয়, ধাতুও নয়| টাকা মূলত আস্থা, বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রীয় ¯^ীকৃতির সমš^য়ে গঠিত একটি সামাজিক চুক্তি| আমরা বিশ্বাস করি বলেই একটি কাগজের টুকরো বা ডিজিটাল সংখ্যা অর্থের মূল্য বহন করে| সেই বিশ্বাসই ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তি|
একদিন হয়তো বিশ্ব পুরোপুরি ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাবে| তখন কাগজের নোটের প্রয়োজন কমে আসবে| কিন্তু মানুষের সম্পদ হারিয়ে যাবে না, কারণ অর্থের প্রকৃত অস্তিত্ব কাগজে নয়, বরং সেই আস্থা ও হিসাবের ব্যবস্থায়|
তাই ব্যাংকিং খাত নিয়ে সমালোচনা, সংস্কারের দাবি কিংবা উদ্বেগ—সবই প্রয়োজনীয়| তবে সেই উদ্বেগ যেন তথ্যভিত্তিক হয়, গুজবনির্ভর না হয়| কারণ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু সবসময় দুর্বল ব্যাংক নয়; অনেক সময় অযৌক্তিক আতঙ্কই একটি দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে|
টাকার প্রকৃত শক্তি কাগজে নয়, মানুষের বিশ্বাসে| আর সেই বিশ্বাস অটুট থাকলেই টিকে থাকে ব্যাংক, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের আর্থিক ভিত্তি|
এম. মুশফিকুর রহমান ব্যাংক কর্মকর্তা


















































