ফিচার এলাটিং বেলাটিং

বিস্ময়কর গ্রহ

জনি সিদ্দিক »

আমাদের চেনা সৌরজগৎ থেকে কয়েকশ আলোকবর্ষ দূরে এক নিঃসঙ্গ গ্রহ- নাম তার ‘ঊণঊ-২’। সেই অচিন গ্রহের একটি নির্জন ঘরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শাহেদের কেবলই বাড়ির কথা মনে পড়ছিল। আজ পাঁচ দিন হলো সে এখানে। হুট করেই এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় পড়ে সে পৌঁছে গেছে এই গ্রহে। পৃথিবীর চেনা আকাশ, মা-বাবা আর ভাই-বোনের মুখগুলোর ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠতেই বুকটা হু হু করে উঠল। বিশেষ করে প্রিয় জন্মস্থান সাজেক ভ্যালির সেই মেঘ-পাহাড়ের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আর প্রিয় জন্মভূমির কথা মনে হতেই তার চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত হয়ে এল।
​ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়াল সেই অদ্ভুত প্রাণীটি। মানুষের মতো গড়ন হলেও এর বৈশিষ্ট্যগুলো একেবারেই আলাদা। প্রাণীটির মাথার সামনে এবং পেছনে দুটো ছোট ছোট চোখ। ঠিক যেন শাহেদের নিজের তৈরি করা সেই ব্যক্তিগত রোবটটির মতো, যাকে সে চারদিকে চারটি চোখ দিয়েছিল যাতে একসাথে চারপাশ দেখা যায়। প্রাণীটির মাথায় কোনো চুল নেই, অনেকটা কমলালেবুর খোসার মতো তার চামড়া। হাত এবং পায়ে মাত্র দুটো করে আঙুল, আর পায়ের পাতাগুলো অস্বাভাবিক লম্বা। তার সুঠাম শরীরটা দেখে বোঝার উপায় নেই সেটা রক্ত-মাংসের তৈরি, নাকি কঠিন ইস্পাতের কোনো বর্ম।
​শাহেদ লক্ষ্য করল, এই গ্রহের আকাশটা অদ্ভুত বেগুনি রঙের। সেখানে কোনো সূর্য নেই, তবুও চারপাশ এক মায়াবী স্নিগ্ধ আলোয় ঝলমল করছে। এখানকার বাতাস অত্যন্ত ভারী এবং স্থির, যেন সময় এখানে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। সবচেয়ে রহস্যময় ব্যাপার হলো, এখানকার মাটি থেকে এক ধরনের মৃদু কম্পন শোনা যায়, যা সরাসরি মস্তিষ্কে এসে ধাক্কা দেয়। প্রাণীটি শাহেদের চোখের দিকে তাকাতেই তার মস্তিষ্কে হাজারো ছবির ঝলক খেলে গেল। যেন এই গ্রহের কয়েক লক্ষ বছরের ইতিহাস এক নিমিষেই তাকে জানিয়ে দেওয়া হলো। কোনো কথা না বলেই সে বুঝতে পারল, এই গ্রহটি আসলে একটি বিশাল কম্পিউটারের মতো কাজ করছে। পুরো গ্রহটি সুশৃঙ্খল; এখানকার সবাই নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী চলে।
​ঊণঊ-২ গ্রহের প্রকৃতি পৃথিবীর মতো নয়। এখানে কোনো সবুজ বনানী নেই, নেই কোনো বয়ে চলা নদী। পশুপাখিও চোখে পড়ে না; শুধু রুক্ষ পাথরের পাহাড়। তবে পাহাড়গুলো রুক্ষ হলেও বেশ দর্শনীয়। মজার ব্যাপার হলো এই গ্রহে তাদের অনুমতি ছাড়া বাইরের কেউ প্রবেশ করতে পারে না। এখানকার বাসিন্দারা ‘মুনিয়াম’ নামক এক বিশেষ গ্যাসের সাহায্যে প্রাণধারণ করে। এই গ্রহের প্রাণীরা কোনো যন্ত্র ছাড়াই একে অপরের মনের কথা বুঝতে পারে। পৃথিবীর খবরাখবরও তাদের নখদর্পণে।
​রহস্যের শেষ এখানেই নয়। শাহেদ যখন তাদের ল্যাবরেটরি সদৃশ একটি কক্ষে গেল, দেখল সেখানে সময়কে নিয়ন্ত্রণ করার অদ্ভুত কিছু কাঁচের গোলক রাখা আছে। তারা চাইলেই অতীতকে ছুঁয়ে আসতে পারে। তাদের প্রযুক্তি অতি উচ্চমানের, ক্ষমতাও মানুষের চেয়ে অত্যাধিক। অথচ এত অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়েও তাদের মধ্যে কোনো অহংকার নেই, কোনো মারামারি বা রাজনৈতিক সংঘাত নেই। কেউ কারো দেশ দখল করে না, কারো হক মেরে খায় না। সবাই সুশৃঙ্খলভাবে তাদের নেতার নির্দেশ মেনে চলে। এক শান্তিময় নিস্তরঙ্গ জীবন তাদের; তাই কোনো মারণাস্ত্রেরও প্রয়োজন পড়ে না।
​শাহেদ মনে মনে লজ্জিত হলো। আমরা মানুষরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভাবলেও কতটুকু জানি এই মহাবিশ্ব সম্পর্কে? আমরা তৈরি করেছি নানা রকমের প্রাণঘাতী বোমা, পারমাণবিক মারণাস্ত্র আর জনপদ ধ্বংসকারী অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি। পৃথিবীতে কেউ শুধু নিজ ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য নিরীহ অসহায় জনপদ ধ্বংস করছে, আর কেউ নিজ অস্তিত্ব ও মাতৃভূমি রক্ষার জন্য আজীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। পুরো পৃথিবীটাই যেন এক অশান্ত কুরুক্ষেত্র।তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মূল উদ্দেশ্যই হলো ভিন্ন মতাবলম্বী দেশের জনগণের মধ্যে অশান্তি তৈরি করে তাদেরকে হেনস্তা করা। অথচ এই উন্নত গ্রহে প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
​গত পাঁচ দিনে শাহেদকে এই গ্রহের জটিল বিজ্ঞান ও দর্শনের রহস্য বুঝতে অনেক সাহায্য করেছে তার ভিনগ্রহী বন্ধুগুলো। আজ বিদায়ের লগ্ন। ঊণঊ-২ গ্রহের বাসিন্দারা চাচ্ছিল শাহেদ যেন তাদের সাথেই থেকে যায়। তাদের মায়া আর আতিথেয়তায় শাহেদের মনটাও ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। তবুও নাড়ির টান বড় প্রবল। পৃথিবীর ধুলোবালি আর মানুষের ভালোবাসা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। অবশেষে বিদায় নিয়ে সে চেপে বসল এক অতি-আধুনিক স্পেসশিপে। মহাশূন্যের বুক চিরে যানটি যখন পৃথিবীর দিকে ছুটতে শুরু করল, শাহেদ তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার অবচেতন মন তখন থেকেই পৃথিবীর নির্মল বাতাস আর প্রিয়জনদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে।