বিশেষ সংখ্যা

পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় আগামী দশকের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি

শত শত বছর ধরে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক অস্তিত্বের জন্য প্রধানত নদী আর উর্বর ভূমির দিকে তাকিয়ে থেকেছে। অথচ উপকূলরেখার ওপারে রয়েছে জাতীয় সম্পদের আরেকটি সমান গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার, বঙ্গোপসাগর। বাংলাদেশের সামুদ্রিক এলাকা প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত, যা মৎস্য আহরণ, নৌপরিবহন, পর্যটন, অফশোর জ্বালানি, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র এবং আরও নানা সমুদ্রনির্ভর কর্মকাণ্ডের জন্য বিশাল অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি করেছে। ব্লু-ইকোনমি বা “সমুদ্র-অর্থনীতি” ধারণাটি তাই বাংলাদেশের জন্য আর কেবল পরিবেশগত বা একাডেমিক বিষয় নয়। এটিকে ক্রমেই একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
তবে আগামী দশক অতীতের চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন হতে চলেছে। বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্র সরে যাচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দিকে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে, সরবরাহ ব্যবস্থা ক্রমশ আঞ্চলিক রূপ নিচ্ছে, জ্বালানি নিরাপত্তা গুরুত্ব পাচ্ছে, আর সামুদ্রিক চোক-পয়েন্টগুলো নতুন করে কৌশলগত তাৎপর্য অর্জন করছে। এই পটভূমিতে উত্তর বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান হতে পারে দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুবিধাগুলোর একটি, অথবা একটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়া সুযোগ। সিদ্ধান্তটা এখন আমাদেরই নিতে হবে।

একটি প্রায় অব্যবহৃত সামুদ্রিক অর্থনীতি
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অসাধারণ গুরুত্বপূর্ণ। এটি বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে, আঞ্চলিক বড় অর্থনীতিগুলোর কাছাকাছি। এই উপসাগর ভারত মহাসাগরকে যুক্ত করেছে মালাক্কা প্রণালী এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে। এখানেই বাংলাদেশের সামনে একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সেবার নিছক গ্রাহক না থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সামুদ্রিক লজিস্টিকস ও সেবা কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার।
বাংলাদেশের প্রায় সমস্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিমাণের হিসেবে সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। অথচ শিপিং, লজিস্টিকস, জাহাজ মালিকানা, সামুদ্রিক সেবা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মূল্যের সিংহভাগই দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই চ্যালেঞ্জটা কেবল বাংলাদেশি বন্দরে জাহাজ ভেড়ার সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং সামুদ্রিক মূল্যশৃঙ্খলের একটি বড় অংশ নিজের হাতে ধরে রাখা।
চট্টগ্রাম, মোংলা, মাতারবারি ও পায়রা বন্দরের উন্নয়ন, ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ বে টার্মিনাল প্রকল্প, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উন্নত সংযোগ, আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল, অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক এবং বিশেষায়িত সামুদ্রিক সেবা, এসব ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে একটি উপকূলীয় বাণিজ্য-নির্ভর দেশ থেকে একটি আঞ্চলিক সামুদ্রিক লজিস্টিকস কেন্দ্রে রূপান্তরিত করতে পারে।

---------

মৎস্যসম্পদ: সবচেয়ে সহজলভ্য ব্লু-ইকোনমি সুযোগ
ব্লু-ইকোনমির সব উপাদানের মধ্যে মৎস্যসম্পদই সম্ভবত সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সুযোগ। বাংলাদেশে ইতিমধ্যেই একটি বিশাল মৎস্যজীবী জনগোষ্ঠী ও সামুদ্রিক মৎস্য খাত রয়েছে। কিন্তু দেশের সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্র এখনো তুলনামূলক অগভীর জলসীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, মাছ ধরার কার্যক্রম মূলত প্রায় ৮০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত সীমিত, যা বাংলাদেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। এর অর্থ, দেশের সামুদ্রিক সম্ভাবনার একটা বড় অংশ এখনো অনাবিষ্কৃত ও অব্যবহৃত রয়ে গেছে।
গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ, আধুনিক ফিশিং ভেসেল, কোল্ড-চেইন অবকাঠামো, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সামুদ্রিক জলজ চাষ, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ এবং উচ্চমূল্যের সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য রপ্তানি, এসব খাত কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় দুটোই বাড়াতে পারে। তবে এই সম্প্রসারণ হতে হবে নিছক আহরণ-প্রচেষ্টা বাড়ানোর বদলে বিজ্ঞানভিত্তিক। অতিরিক্ত মাছ ধরা, অপরিণত মাছ আহরণ, অবৈধ মৎস্য শিকার এবং ধ্বংসাত্মক পদ্ধতি ইতিমধ্যেই সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংক বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছ ধরার এলাকাগুলোর অতিরিক্ত ব্যবহারসহ এসব সমস্যা চিহ্নিত করেছে।
তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি আধুনিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো, যা ভেসেল মনিটরিং, মজুদ মূল্যায়ন, লাইসেন্সিং, আইন প্রয়োগ, মৌসুমি সংরক্ষণ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠবে। ভেসেল মনিটরিং সিস্টেম ও অন্যান্য ট্র্যাকিং প্রযুক্তির সাম্প্রতিক শক্তিশালীকরণ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, এই ধারা আরও গতিশীল করতে হবে।

অফশোর জ্বালানি: সুযোগ এবং কৌশলগত অপরিহার্যতা
আগামী দশকে জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব ক্রমেই বাড়বে। আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত নির্ভরতা অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক মূল্য অস্থিরতা, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে বিঘ্নের ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোর সংঘাত ও অস্থিরতা দেখিয়ে দিয়েছে, হাজার মাইল দূরের ঘটনাও কতটা দ্রুত জ্বালানি মূল্য ও জাতীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
বঙ্গোপসাগরে অফশোর তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনা থাকলেও, ভবিষ্যতের জ্বালানি নীতি একচেটিয়াভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। বরং অধিকতর কৌশলগত সুযোগ নিহিত থাকতে পারে অফশোর নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে, বিশেষত অফশোর বায়ুবিদ্যুতে, পাশাপাশি সামুদ্রিক জ্বালানি গবেষণা ও অন্যান্য উদীয়মান প্রযুক্তিতে।
বাংলাদেশের উচিত অফশোর বায়ু সম্পদ, সমুদ্রতলের অবস্থা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রয়োজনীয়তা এবং বিনিয়োগ সম্ভাব্যতা নিয়ে গুরুত্ব সহকারে মূল্যায়ন শুরু করা। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি জ্বালানি সমন্বয় গড়ে তোলা, যেখানে দেশীয় গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অফশোর সম্পদ একসঙ্গে কাজ করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে আমদানি-নির্ভরতা কমাবে।

বন্দর, নৌপরিবহন ও সামুদ্রিক লজিস্টিকস
বাংলাদেশের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে বড় ব্লু-ইকোনমি সুযোগ নিহিত রয়েছে সামুদ্রিক লজিস্টিকসে।
দেশটির আরেকটি সিঙ্গাপুর হয়ে ওঠার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এটি নিজের অর্থনীতির জন্য এবং সম্ভবত বৃহত্তর অঞ্চলের একাংশের জন্যও একটি অত্যন্ত দক্ষ সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার হয়ে উঠতে পারে।
একটি আধুনিক সামুদ্রিক লজিস্টিকস বাস্তুতন্ত্রে থাকা উচিত,
– গভীর জলের বন্দর ও দক্ষ কনটেইনার টার্মিনাল;
– আধুনিক জাহাজ-থেকে-জেটিতে হ্যান্ডলিং ব্যবস্থা;
– অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো ও ফ্রেইট টার্মিনাল;
– উপকূলীয় নৌপরিবহন;
– জাহাজ, কনটেইনার তৈরি, মেরামত, ডকিং ও রক্ষণাবেক্ষণ;
– সামুদ্রিক বীমা ও আর্থিক সেবা;
– সামুদ্রিক আইনি ও সালিসি সেবা;
– ডিজিটাল কার্গো ডকুমেন্টেশন;
– লজিস্টিকস প্রযুক্তি;
– বাংকারিং ও সামুদ্রিক সেবা;
– দক্ষ নাবিক ও সামুদ্রিক পেশাজীবী।

একটি শক্তিশালী উপকূলীয় শিপিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সড়ক ও মহাসড়কের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি লজিস্টিকস খরচও কমিয়ে আনতে পারে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতি কনটেইনারে সংযোজিত মূল্য বাড়ানো, কেবল কনটেইনার পরিবহনের সংখ্যা বাড়ানো নয়।

জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্প
বাংলাদেশের ইতিমধ্যেই জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পে অভিজ্ঞতা রয়েছে। যথাযথ বিনিয়োগ, নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের মাধ্যমে এই খাতগুলো ব্লু-ইকোনমির গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশি শিপইয়ার্ডগুলো লক্ষ্য করতে পারে ছোট ও মাঝারি আকারের বাণিজ্যিক জাহাজ, ফিশিং ভেসেল, অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় জাহাজ, অফশোর সাপোর্ট ভেসেল এবং বিশেষায়িত জলযান।
একই সঙ্গে, জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পকে ক্রমেই আন্তর্জাতিক পরিবেশগত ও কর্মক্ষেত্র-নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত, নিছক সস্তা জাহাজ রিসাইক্লিং এর গন্তব্য থেকে বেরিয়ে একটি নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সামুদ্রিক পুনর্ব্যবহার কেন্দ্রে পরিণত হওয়া। এতে আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে এবং উচ্চমূল্যের সামুদ্রিক শিল্প স্থাপনের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

সামুদ্রিক পর্যটন: একটি অনুন্নত সম্ভাবনা
বাংলাদেশের রয়েছে কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, সুন্দরবন এবং একটি দীর্ঘ উপকূলরেখা। তবু সামুদ্রিক ও উপকূলীয় পর্যটন এখনো তুলনামূলকভাবে অনুন্নত রয়ে গেছে। এখানে লক্ষ্য অনিয়ন্ত্রিত গণপর্যটন গড়ে তোলা নয়, যা উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করবে। বরং বাংলাদেশের গড়ে তোলা উচিত টেকসই সামুদ্রিক পর্যটনÍইকো-রিসোর্ট, ক্রুজ পর্যটন, সামুদ্রিক বিনোদন, ডাইভিং, নৌ-ভ্রমণ, মৎস্য শিকার-পর্যটন, ম্যানগ্রোভ পর্যটন এবং সতর্কভাবে পরিচালিত দ্বীপ গন্তব্যস্থল। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক উপকূলীয় ও সামুদ্রিক পর্যটনকে বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ব্লু-ইকোনমি সুযোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সুন্দরবনকে বিশেষভাবে নিছক একটি পর্যটন গন্তব্য নয়, বরং একটি বিশ্বগুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, যার সংরক্ষণেরও নিজস্ব অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে।

পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা
আগামী দশকে বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করবে সম্ভবত অর্থনীতি একা নয়, বরং ভূ-রাজনীতি। বঙ্গোপসাগর ক্রমেই বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং আসিয়ান দেশগুলোসবারই বৃহত্তর ভারত মহাসাগর অঞ্চলে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। একই সময়ে লোহিত সাগর, বাব-এল-মান্দেব এবং অন্যান্য সামুদ্রিক চোকপয়েন্টের বিঘ্ন বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনশীল পরিবেশ সুযোগ ও ঝুঁকি দুটোই তৈরি করে।
দেশকে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ঐতিহ্যগত নীতি অব্যাহত রাখতে হবে, একইসঙ্গে নিজের সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশের উচিত একাধিক অংশীদারের কাছ থেকে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি চাওয়া, কোনো একক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে।অর্থনৈতিক উন্মুক্ততার অর্থ কৌশলগত নির্ভরতা নয়।একটি শক্তিশালী সামুদ্রিক অর্থনীতি নিজেই বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়ে দেবে।

সামুদ্রিক নিরাপত্তার গুরুত্ব
একটি বৃহত্তর সামুদ্রিক অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী সামুদ্রিক নিরাপত্তা। অবৈধ, অপ্রতিবেদিত ও অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণ, মানব ও মাদক পাচার, জলদস্যুতা, সামুদ্রিক দূষণ, বন্দরের ওপর সাইবার হামলা, পানির নিচের অবকাঠামোর ঝুঁকি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ, এসবই সরাসরি ব্লু ইকোনমিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, বন্দর কর্তৃপক্ষ, সামুদ্রিক সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ক্রমেই বাড়বে। সমন্বিত রাডার, এআইএস, স্যাটেলাইট নজরদারি, ভেসেল মনিটরিং এবং তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার মাধ্যমে সামুদ্রিক ডোমেইন সচেতনতা জোরদার করতে হবে। লক্ষ্য বঙ্গোপসাগরের সামরিকীকরণ নয়। বরং বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি নিরাপদ সামুদ্রিক পরিবেশ, যেখানে বৈধ বাণিজ্য নির্বিঘ্নে বিকশিত হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন: দীর্ঘমেয়াদী এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক সুযোগের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, উপকূলীয় ভাঙন, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, সমুদ্রের উষ্ণায়ন এবং মৎস্যমজুদের পরিবর্তন, এসব উপকূলীয় জনগোষ্ঠী ও সামুদ্রিক অবকাঠামোর জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। তাই প্রতিটি ব্লু-ইকোনমি বিনিয়োগে জলবায়ু সহনশীলতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বন্দর, টার্মিনাল, শিপইয়ার্ড, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, পর্যটন অবকাঠামো এবং উপকূলীয় শিল্পগুলো ক্রমেই তীব্রতর জলবায়ু ঝুঁকি মাথায় রেখে নকশা করতে হবে। জলবায়ু অভিযোজন ও দুর্যোগ প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে, তবে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগে সহনশীলতার ওপর আরও জোরালো মনোযোগ প্রয়োজন হবে।

সুশাসনের চ্যালেঞ্জ
সবচেয়ে বড় বাধা সম্পদের অভাব নয়, বরং বিভক্ত ও খণ্ডিত প্রশাসনিক কাঠামো। ব্লু-ইকোনমি একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থার আওতায় পড়ে, শিপিং, মৎস্য, জ্বালানি, পরিবেশ, পর্যটন, প্রতিরক্ষা, বন্দর, পররাষ্ট্র বিষয়ক এবং স্থানীয় সরকার। সমন্বয় না থাকলে বিভিন্ন সংস্থা পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য অনুসরণ করতে পারে।

মানবসম্পদ
দক্ষ জনশক্তি ছাড়া কোনো সামুদ্রিক কৌশলই সফল হতে পারে না।বাংলাদেশের উচিত নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করা:
ক। সামুদ্রিক প্রকৌশল, সমুদ্রবিজ্ঞান, মৎস্যবিজ্ঞান, সামুদ্রিক আইন, নৌ-স্থাপত্য, সামুদ্রিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিকস, বন্দর ব্যবস্থাপনা, হাইড্রোগ্রাফি, অফশোর প্রকৌশল, সামুদ্রিক সাইবার নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক জীবপ্রযুক্তি।
খ। দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে, এবং সামুদ্রিক খাত দক্ষ কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠতে পারে। তবে এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, সামুদ্রিক একাডেমি, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা কেন্দ্রে বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাই ব্লু ইকোনমিকে কেবল একটি অবকাঠামো কর্মসূচি নয়, বরং একটিজ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিহিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

উপসংহার
আগামী দশক হতে পারে সমুদ্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের এক নির্ণায়ক অধ্যায়। বিশ্ব এগিয়ে চলেছে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, আন্তঃসংযুক্ত ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইন্দো-প্যাসিফিকের দিকে। সরবরাহ ব্যবস্থা নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে, সামুদ্রিক নিরাপত্তার গুরুত্ব বাড়ছে, আর দেশগুলো জ্বালানি, বাজার, প্রযুক্তি ও কৌশলগত প্রভাবের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। বাংলাদেশের রয়েছে মূল্যবান ভৌগোলিক অবস্থান, বিশাল সামুদ্রিক ভূখণ্ড, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং একটি তরুণ জনগোষ্ঠী। এখন প্রয়োজন কেবল একটি স্পষ্ট জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি।
ব্লু-ইকোনমি আর নীতিদলিলের একটি অধ্যায় বা সম্মেলনের স্লোগান হয়ে থাকতে পারে না। এটিকে হয়ে উঠতে হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পরিকল্পনারমূল স্তম্ভ। সুশাসন, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, আধুনিক বন্দর, টেকসই মৎস্যসম্পদ, অফশোর জ্বালানি, সামুদ্রিক পর্যটন, জাহাজ নির্মাণ, দক্ষ মানবসম্পদ এবং কার্যকর সামুদ্রিক নিরাপত্তা, এই সবকিছু একত্রিত করতে পারলে বঙ্গোপসাগর হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই প্রশ্নটা আর এই নয় যে বাংলাদেশের কোনো ব্লু-ইকোনমি আছে কি না। প্রশ্নটা হলো, তার কী আছে এমন দৃষ্টিভঙ্গি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সাহস, যা দিয়ে সে সেটি গড়ে তুলবে!
“আগামী দশক তাদেরই, যারা ভূগোলকে কৌশলে এবং কৌশলকে টেকসই সমৃদ্ধিতে রূপান্তরিত করতে পারে।“

লেখক: কমান্ডার মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী, পিএসসি, (অবঃ)। অবসর প্রাপ্ত নৌবাহিনীর কর্মকর্তা, লেখক ও চিন্তাবিদ।