সুপ্রভাত ডেস্ক »
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র ও মাদক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক মন্ত্রী মহসিন রেজা নাকভি দুই দিনের সফরে আজ (শুক্রবার) ঢাকা আসছেন। নির্বাচনের পর দেশটির কোনো মন্ত্রীর এটিই প্রথম ঢাকা সফর। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের বিভিন্ন ইস্যুতে যোগাযোগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে এই সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঢাকাস্থ পাকিস্তান হাইকমিশন এই সফরকে ঘিরে বাংলাদেশ সরকারকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।
দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি শুক্রবার (৮ মে) ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৪২ ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। সফর শেষে তিনি ৯ মে রাত ৮টা ১০ মিনিটে বিজি-৩৪১ ফ্লাইটে ঢাকা ত্যাগ করবেন। ৫ মে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক নোট ভারবালে পাকিস্তান হাইকমিশন মন্ত্রীর নিরাপত্তা ও আনুষ্ঠানিক প্রটোকল নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছে।
পাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার স্ত্রীরও এই সফরে আসার কথা রয়েছে। এই দম্পতিকে স্বাগত জানাতে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য উপহার হিসেবে দেশীয় তাঁতের শাড়ি ও পাঞ্জাবি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এবারের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে বিস্তৃত আন্তর্দেশীয় মাদক চোরাচালান চক্র, সন্ত্রাসী অর্থায়ন, সাইবারভিত্তিক উগ্রবাদ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন। বিশেষ করে আফগানিস্তান-পাকিস্তান হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া মাদক রুট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়াবা, হেরোইন, আইসসহ বিভিন্ন মাদকের নতুন রুট ও নেটওয়ার্কের কারণে চাপের মুখে রয়েছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সন্দেহভাজন অপরাধীদের তথ্য আদান-প্রদান, পাচার রুট শনাক্তকরণ এবং যৌথ নজরদারি ব্যবস্থার বিষয়ে আলোচনা গুরুত্ব পাবে এবং এই সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক সই হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শুধু মাদক নয়, অনলাইনভিত্তিক উগ্রবাদী প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে জঙ্গি নেটওয়ার্ক পরিচালনা, অর্থপাচার এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ শনাক্ত করাও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে রিক্রুটমেন্ট, অর্থ সংগ্রহ ও যোগাযোগের বিষয়গুলো এখন দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, সাইবার গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানো এবং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই দেশ নীতিগত ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া মানবপাচার, ভুয়া পাসপোর্ট ও ট্রাভেল ডকুমেন্ট ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের চলাচল ও দমনে যৌথ সমন্বয় ব্যবস্থাও আলোচনায় আসতে পারে।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় মাদক ও সন্ত্রাসবাদ আর শুধু কোনো একক দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি এখন আন্তর্দেশীয় নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তাই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্ভাব্য এই সমঝোতা আঞ্চলিক
তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় মাদক পাচার, জঙ্গি অর্থায়ন, অনলাইনভিত্তিক উগ্রবাদ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ এখন একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এসব মোকাবিলায় শুধু সীমান্ত পাহারা দিয়ে হবে না, প্রয়োজন গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত আঞ্চলিক উদ্যোগ।’
কর্নেল কাজী শরীফ উদ্দিন আরও বলেন, বাংলাদেশ গত এক দশকে জঙ্গিবাদ দমনে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা দেখিয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানেরও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে যদি বাস্তবভিত্তিক তথ্য আদান-প্রদান, সন্দেহভাজন নেটওয়ার্ক ট্র্যাকিং এবং আর্থিক গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়ে, তাহলে তা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে।
তিনি মনে করেন, এই সমঝোতা শুধু আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়ন কাঠামো কার্যকর করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে। যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ, নিয়মিত তথ্য বিনিময় এবং ফলোআপ মেকানিজম নিশ্চিত করতে পারলে এই উদ্যোগ কার্যকর ফল দিতে পারে।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন রেজা নাকভি সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছিলেন। সেই বৈঠকে পুলিশ প্রশিক্ষণে দুই দেশের পুলিশ একাডেমির পারস্পরিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক ও অফিসিয়াল পাসপোর্টধারীদের জন্য অন অ্যারাইভাল ভিসা, রোহিঙ্গা ইস্যু, সাইবার ক্রাইম দমন, ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধিসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
এছাড়া, ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি টানা নয় দিনের জন্য পাকিস্তান সফর করেন। ওই সফরে কূটনৈতিক ও আনুষ্ঠানিক পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা সহজীকরণ, সরকারি সফর সহজতর করা, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত বিনিময় বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছিল।




















































