ফিচার এলাটিং বেলাটিং

ছোটোদের কবি নজরুল

১১ জ্যৈষ্ঠ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী

তাঁর প্রতি অতল শ্রদ্ধা

 

এম আব্দুল হালীম বাচ্চু

কাজী নজরুল ইসলাম- এই নামটি শুনলেই মনে পড়ে আগুনঝরা কবিতা, গান আর সাহসের কথা| কিন্তু ছোটোদের কাছে তিনি শুধু বিদ্রোহের কবি নন, তিনি ছিলেন খুব মজার, প্রাণবন্ত আর দুঃখজয়ী একজন মানুষও|
একদিন গ্রামের স্কুলে শিক্ষক শিশুদের বললেন, “আজ তোমাদের এমন একজন মানুষের গল্প শোনাব, যিনি ছোটোবেলায় অনেক কষ্ট পেয়েও বড়ো হয়ে সবার প্রিয় কবি হয়েছেন|” শিশুরা গোল হয়ে বসে রইল| শিক্ষক শুরু করলেন নজরুলের গল্প|
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান (বর্তমানে পশ্চিম বর্ধমান) জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে মে জন্ম নেন কাজী নজরুল ইসলাম| তাঁর বাবার নাম ছিল কাজী ফকির আহমদ| তিনি ছিলেন মসজিদের ইমাম ও খাদেম| তাঁর মায়ের নাম ছিল জাহেদা খাতুন| মা ছিলেন স্নেহময়ী, সংসারের কষ্ট সামলেও ছেলেকে ভালোবাসা দিয়ে বড়ো করেছিলেন|
শিশুকালে নজরুলের ডাকনাম ছিল “দুখু মিয়া”| নামটা শুনে অনেকেই অবাক হয়| কিন্তু এই নামের পেছনে ছিল জীবনের কষ্টের ছাপ| বাবাকে ছোটো বয়সেই হারিয়েছিলেন তিনি| সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে| পড়াশোনা করতে চাইলেও সময় সুযোগ পেতেন না|
কিন্তু দুখু মিয়ার মন ছিল অন্যরকম| তিনি গান গাইতে ভালোবাসতেন, কবিতা লিখতে ভালোবাসতেন| গ্রামের লেটো দলে যোগ দিয়েছিলেন| সেই দলে নাটক হতো, গান হতো, পালা হতো| ছোট্ট নজরুল সেখানে গান লিখতেন, অভিনয় করতেন| তখনই সবাই বুঝতে পারে, এই ছেলেটার ভেতরে অন্যরকম আলো আছে|
একদিন এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই বড়ো হয়ে কী হবি?” নজরুল হেসে বলেছিলেন, “আমি গান লিখব, কবিতা লিখব, সবাইকে জাগাব|” সত্যিই তাই হলো|
কিশোর বয়সে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন| ˆসনিক হিসেবে কাজ করলেও কবিতা লেখা ছাড়েননি| সেনাশিবিরে বসেও লিখতেন| তখন তাঁর কলমে জেগে উঠত ¯^াধীনতার ¯^প্ন| তিনি বুঝেছিলেন, মানুষের ওপর অন্যায় হলে চুপ থাকা যায় না|
পরে তিনি লিখলেন বিখ্যাত কবিতা বিদ্রোহী| এই কবিতা পড়ে মানুষ অবাক হয়ে গেল| সবাই বলতে লাগল- এই তো সত্যিকারের বিদ্রোহী কবি|
কিন্তু নজরুল শুধু রাগের কবি ছিলেন না| তিনি ছোটোদেরও খুব ভালোবাসতেন| তিনি লিখেছেন অনেক ছড়া, গান আর গল্প| লিচুচোর পড়লে শিশুরা আজও হাসে| তাঁর লেখা খুকি ও কাঠবিড়ালি শুনলে মনে হয় যেন ছোট্ট শিশুর মুখের কথা|
তিনি প্রায় চার হাজারেরও বেশি গান লিখেছেন| এসব গানকে বলা হয় নজরুলসংগীত| প্রেম, দেশ, ভক্তি, মানবতা—সবই ছিল তাঁর গানে|
তিনি ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ৪৩ বছর বয়সে একটি বিরল ও দুরারোগ্য স্নায়বিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি ও শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেন|
৭৭ বছর বয়সে নজরুলের স্বাস্থ্যেরও অবনতি হতে শুরু করে| জীবনের শেষ দিনগুলো কাটে ঢাকার পিজি হাসপাতালে| ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগস্ট পুরো বাঙালি জাতিকে কাঁদিয়ে তিনি ওপারে চলে যান!
তাঁর সমাধি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে অবস্থিত| এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় টিএসসি এবং পাবলিক লাইব্রেরির খুব কাছেই অবস্থিত| তিনি জাতীয় কবি হিসেবে আমাদের মাঝে পরিচিত|
শিক্ষক গল্প শেষ করে বললেন, “নজরুল কেন বড়ো জানো? কারণ, তিনি কষ্টকে হার মানিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলেন| অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন| মানুষকে ভালোবেসেছিলেন|” তাই ছোটোদের নজরুল মানে শুধু বইয়ের কবি নন; তিনি এমন এক বন্ধু, যিনি শিখিয়েছেন—অভাব কোনো বাধা নয়, সাহসই মানুষকে বড়ো করে|