বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৩, ২০২৬
টপ নিউজ

আদালতে ঋণ শোধের আশ্বাস দিয়ে স্বপরিবারে দেশত্যাগ

এম এন নিটওয়্যারের তিন ব্যাংকে খেলাপি ২৫০ কোটি টাকা

ওমর ফারুক »

চট্টগ্রামের পোশাকশিল্প উদ্যোক্তা মো. মঈন উদ্দিন আহমেদ (মিন্টু) আদালতে ঋণ পরিশোধের আশ্বাস দিয়ে বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রির অনুমতি নেন। কিন্তু ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ না করেই তিনি স্বপরিবারে দেশত্যাগ করেন ।

---------

বর্তমানে তিনি কানাডায় অবস্থান করছেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের দাবি।

এদিকে তাঁর প্রতিষ্ঠান এম এন নিটওয়্য্যারস গ্রুপের কাছে তিনটি ব্যাংকের প্রায় ২৫০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আটকে আছে। আদালতের রায়, একাধিক মামলা, কারখানা বন্ধ এবং পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

সর্বশেষ গত ৬ আগস্ট চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত-৩-এর বিচারক সেজুতি জান্নাত ওয়ান ব্যাংকের করা অর্থঋণ মামলায় রায় দিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে খরচসহ ১১৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেন। এর আগে একই মামলায় আদালতের অনুমতি নিয়ে বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রির সুযোগ পান মঈন উদ্দিন। আদালতে তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন, সম্পত্তি বিক্রির অর্থ দিয়ে ব্যাংকের ঋণ শোধ করবেন। কিন্তু সেই অর্থ ব্যাংককে পরিশোধ না করেই দেশ ছাড়েন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ওয়ান ব্যাংকের কাছে এম এন নিটওয়্যারের খেলাপি ঋণ ১১৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা, ইসলামী ব্যাংকের কাছে ১০৬ কোটি টাকা এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের কাছে ২৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে তিন ব্যাংকের পাওনা প্রায় ২৫০ কোটি টাকা।

ওয়ান ব্যাংকের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী নাঈম ভুঁইয়া বলেন, ঋণ খেলাপির মামলায় ব্যাংকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৫ মে আদালত এম এন নিটওয়্যারের সম্পত্তির ওপর ক্রোকাদেশ দেন। পরে একই বছরের জুলাইয়ে মঈন উদ্দিন আদালতে আবেদন করে জানান, সম্পত্তি বিক্রি করে তিনি ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করবেন। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করলে ৮ সেপ্টেম্বর সম্পত্তি বিক্রি করেন। কিন্তু ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ না করেই বিদেশে চলে যান।

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, ২০২৫ সালের শেষ দিকে মঈন উদ্দিন স্ত্রী রোকসানা আহমেদ ও ছেলে মুসলিম উদ্দিন আহমেদকে নিয়ে প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র এবং পরে কানাডায় চলে যান। চলতি বছরের জানুয়ারিতে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশত্যাগের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ব্যবসায়িক কাজে পরিবারের সঙ্গে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তবে সাত মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি দেশে ফেরেননি। এমনকি গতকাল বুধবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা (ম্যাসেজ) পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

গতকাল বুধবার নগরীর ঈদগা এলাকায় এম এন নিটওয়্যারের কারখানা ও মঈন উদ্দিনের বাসভবনে গিয়ে দুটিই তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা জানান, গত বছরের শেষ দিকে তিনি পরিবার নিয়ে বিদেশে চলে যান। এরপর বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা কয়েক দফা এলেও কারখানা ও বাসা বন্ধ পেয়ে ফিরে যান।

তিন যুগের সফল প্রতিষ্ঠান থেকে বন্ধ কারখানা

চট্টগ্রামভিত্তিক রপ্তানিমুখী পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এম এন নিটওয়্যারস গ্রুপের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৬ সালে সীমা গার্মেন্টস লিমিটেডের মাধ্যমে। পরে পর্যায়ক্রমে এম এন নিটওয়্যারস, এম এন ব্রাদার্স ওয়্যারস ও এম এন ক্লথিং প্রতিষ্ঠা করা হয়। একসময় প্রতিষ্ঠানটির চারটি কারখানায় প্রায় দুই হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। বছরে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার ডজন পোশাক উৎপাদন করে ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি ৭২ লাখ ১৯ হাজার ৮২৩ ডলারের পোশাক রপ্তানি করে, যা ছিল তাদের সর্বোচ্চ রপ্তানি। এরপর ধীরে ধীরে রপ্তানি কমতে থাকে। ২০২২ সালে রপ্তানি নেমে আসে মাত্র ২৫ হাজার ৫৭৫ ডলারে। আর ২০২৩ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে উৎপাদনও বন্ধ হয়ে পড়ে।

কেন ধসে পড়ল ব্যবসা

ব্যাংক কর্মকর্তা, পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠাতা মুনির আহমেদের মৃত্যুর পর দুই ভাইয়ের ব্যবসা আলাদা হয়ে যায়। এরপর এম এন নিটওয়্যারের দায়িত্ব নেন মঈন উদ্দিন আহমেদ। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছর ভালো চললেও করোনা মহামারির পর আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের অর্ডার কমে যায়। অন্যদিকে শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, ব্যাংক সুদ ও পরিচালন ব্যয় অব্যাহত থাকায় কার্যকর মূলধনের সংকট তৈরি হয়। পরবর্তীতে নতুন অর্থায়ন না পাওয়ায় উৎপাদন ও রপ্তানি ক্রমেই কমে যায়।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ব্যবসায় মন্দার পাশাপাশি মঈন উদ্দিনের ব্যক্তিগত ব্যয়ও ছিল বেশি। বিলাসবহুল জীবনযাপন, বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের নির্বাচন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়। ব্যবসার আয় কমলেও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। ফলে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

ঋণ বাড়তে বাড়তে খেলাপি

ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০০২ সাল থেকে ওয়ান ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার গ্রাহক ছিল এম এন নিটওয়্যার। ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করলেও পরে তা অনিয়মিত হয়ে পড়ে। তিন দফা ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার পরও ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়। ২০২৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ওয়ান ব্যাংক অর্থঋণ মামলা দায়ের করে। এছাড়া পাঁচটি চেক প্রত্যাখ্যান মামলাও করেছে ব্যাংকটি।

ওয়ান ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, ১১৩ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে তাদের কাছে বন্ধক রয়েছে নগরীর ঈদগা এলাকার মাত্র ১১ শতক জমি, যার বর্তমান বাজারমূল্য সর্বোচ্চ দুই কোটি টাকা। ইসলামী ব্যাংকের কাছে ১০৬ কোটি টাকা এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের কাছে ২৭ কোটি টাকাও খেলাপি হয়েছে। দুটি ব্যাংকই ঋণ আদায়ে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ঋণের বিপরীতে থাকা জামানতের মূল্য পাওনার তুলনায় খুবই কম হওয়ায় পুরো অর্থ আদায় করা কঠিন হবে।
গত বছরের অক্টোবরের শুরুতে মঈন উদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে রপ্তানির আদেশ কমে যাওয়ায় সাময়িকভাবে কারখানার উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে।

কিন্তু এরপর আর উৎপাদন চালু হয়নি। এখন আদালতের রায়, প্রায় ২৫০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ এবং কর্ণধারের দেশত্যাগ—সব মিলিয়ে এক সময়ের সফল এই রপ্তানিমুখী শিল্পগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।