মতামত সম্পাদকীয়

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার লাগাম টানবে কে

গত জুলাই মাসে সারাদেশে ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৪১৬ জন নিহত এবং ৬২৯ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে, মোট মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। গত মাসে মোট ১৫৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৮ জন নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার শিকার বড় একটি অংশ পথচারী। এ সময়ে ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর এক-চতুর্থাংশ। গত বৃহস্পতিবার রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশ করা প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। চট্টগ্রামেও এই পরিস্থিতি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের সবকটি সড়ক এখন আর কেবল চলাচলের মাধ্যম নয়, যেন এক একটি মৃত্যুফাঁদ। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩০ শতাংশই ঘটছে মোটরসাইকেলকে কেন্দ্র করে। প্রতিদিন গণমাধ্যমের পাতায় চোখ রাখলেই ভেসে ওঠে কোনো না কোনো তরুণের তাজা প্রাণ ঝরে পড়ার করুণ সংবাদ। সড়ক দুর্ঘটনার এই উদ্বেগজনক চিত্র কেবল একক কোনো পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর এক ভয়াবহ আঘাতও বটে।
তবে এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। এর কারণ, অনিয়ন্ত্রিত ও বিশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থা, যার বিকল্প হিসেবে দ্রুত যাতায়াতের জন্য মানুষ বিপুল সংখ্যায় দুই চাকার এই বাহনের দিকে ঝুঁকছে। রাইড শেয়ারিং সেবার প্রসার এবং সহজে বাইক কেনার সুযোগ এই সংখ্যাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও সড়ক নিরাপত্তা সচেতনতা তৈরি হয়নি বিন্দুমাত্র।
সংকটের মূল কারণগুলো স্পষ্ট, বিশেষ করে তরুণ চালকদের মধ্যে ওভারটেকিং এবং হেলমেট ব্যবহারে চরম অবহেলা। ভুয়া বা প্রশিক্ষণহীন চালক। মহাসড়কে ধীরগতির ও দ্রুতগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেনের অভাব। ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ও ধারাবাহিক শাস্তির অনুপস্থিতি।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে অবিলম্বে সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে হবে। শুধু চালকদের ওপর দায় না চাপিয়ে দূরদর্শী প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি যেমন, জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে মোটরসাইকেলের জন্য নির্দিষ্ট গতিসীমা নির্ধারণ করে তা সিসিটিভি ও স্পিড গান দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। মানহীন হেলমেট বিক্রয় বন্ধ এবং রাইডার ও আরোহী উভয়ের জন্যই সার্টিফাইড হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা। যথাযথ ড্রাইভিং পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স দেওয়া পুরোপুরি বন্ধ করা এবং ট্রাফিক নিয়মের ওপর প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা । মহাসড়কে ছোট আকারের বাইক চলাচলে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করা।
একটি অকালমৃত্যু কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করে না, দেশের সম্ভাবনাময় মানবসম্পদকে নিঃশেষ করে দেয়। সড়ক নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই এখনই বাইক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে।

---------