বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬
এ মুহূর্তের সংবাদ

ভুয়া সফটওয়্যারে ৫৬৩ কোটি লোপাট

ব্রোকারেজ হাউসের অনিয়ম

সুপ্রভাত ডেস্ক »

পুঁজিবাজারে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর অনিয়ম ও বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ ঠেকাতে আকস্মিক পরিদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

---------

এ জন্য আট সদস্যের একটি স্থায়ী যৌথ পরিদর্শন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিটিতে বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) ও সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) দুজন করে প্রতিনিধি থাকবেন।

কমিটির সদস্য মনোনয়নের জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট চার প্রতিষ্ঠানের কাছে পৃথক চিঠি পাঠিয়েছে বিএসইসি। এই কমিটি স্টক ব্রোকার ও স্টক ডিলারদের কার্যালয়ে সরেজমিনে আকস্মিক পরিদর্শন করবে। এর মাধ্যমে কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট (সিসিএ), গ্রাহকের শেয়ার ও অর্থ, নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান এবং মার্জিন ঋণসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম যাচাই করা হবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসে ভুয়া বা ডুপ্লিকেট ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার, গ্রাহকের অজান্তে শেয়ার বিক্রি এবং সিসিএর অর্থ সরিয়ে নেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের তথ্য সামনে আসার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।

ডিএসইর সাম্প্রতিক পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাতটি ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধে প্রায় ৪৫ হাজার বিনিয়োগকারীর ৫৬৩ কোটি ২২ লাখ টাকা ও শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে মোট ঘাটতির পরিমাণ ৬৫০ কোটি টাকার বেশি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে গত সোমবার ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এক উন্মুক্ত আলোচনায় বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান ব্রোকারেজ হাউসের ওপর নজরদারি বাড়ানোর কথা জানান। তিনি বলেন, ব্রোকারদের নানা ধরনের সমস্যা থাকতে পারে। এর মধ্যে কিছু নিয়মনীতি সংক্রান্ত, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্টে (সিসিএ) ঘাটতি থাকে, যা বছরের পর বছর ধরে জমে থাকতে পারে।

তার মতে, এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে ঝুঁকিভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করে আকস্মিক পরিদর্শন চালানো প্রয়োজন। অতীতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিসিএতে ঘাটতি শনাক্ত হওয়ার পর অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পরে সেই অর্থ আবার তুলে নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি ঠেকাতে বিএসইসি ও ডিএসই নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শনে একমত হয়েছে।

যেভাবে অতীতে অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে

ডিএসইর পরিদর্শনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, জালিয়াতির অন্যতম প্রধান কৌশল ছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারের পরিবর্তে ভুয়া বা ডুপ্লিকেট সফটওয়্যার ব্যবহার করা। এর মাধ্যমে ডিএসই ও বিনিয়োগকারীদের কাছে এক ধরনের তথ্য দেখানো হলেও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থায় রাখা হতো ভিন্ন তথ্য। ফলে প্রকৃত হিসাব গোপন করে গ্রাহকের অর্থ ও শেয়ার সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

আরেকটি কৌশল ছিল সিডিবিএলের ব্যবস্থায় গ্রাহকের মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করে নিজেদের নম্বর যুক্ত করা। এতে শেয়ার কেনাবেচার এসএমএস বা অন্যান্য নোটিফিকেশন প্রকৃত বিনিয়োগকারীর কাছে না গিয়ে সংশ্লিষ্ট অসাধু ব্যক্তিদের কাছে যেত। ফলে বিনিয়োগকারীর অজান্তে তার শেয়ার বিক্রি করে অর্থ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।

ডিএসইর প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি ১৬১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে মশিউর সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে সিসিএতে ঘাটতি ৬৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং গ্রাহকের শেয়ার বিক্রি করে আত্মসাতের পরিমাণ ৯২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বলে পৃথক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এছাড়া, তামহা সিকিউরিটিজে ১৩৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা, সালতা ক্যাপিটালে ১০০ কোটি ৫২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজে প্রায় ৮০ কোটি টাকা (নিরীক্ষায় যা ১০৫ কোটি টাকা), বাংকো সিকিউরিটিজে ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর সিকিউরিটিজে ১৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ব্লু চিপ সিকিউরিটিজের (সাবেক খুরশিদ সিকিউরিটিজ) বিরুদ্ধেও গ্রাহকের সোয়া দুই কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি ও অর্থ আত্মসাৎ করার প্রমাণ মিলেছে।

অনিয়ম ঠেকাতে সফটওয়্যারে জোর

বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার সুরক্ষায় বিএসইসি ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব ব্রোকারেজ হাউসে অপরিবর্তনযোগ্য ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার চালুর নির্দেশ দিয়েছিল। তবে ডিএসইর অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২৮০টি ব্রোকারেজ হাউস নতুন সফটওয়্যার গ্রহণ করলেও ১১৮টিতে বিনিয়োগকারীর তথ্য এবং ১০২টিতে লেজার ও পোর্টফোলিও স্থানান্তরের কাজ শেষ হয়নি। ২৪টি প্রতিষ্ঠান তখনও পুরোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করছিল। আবার ১৩৫টি ব্রোকারেজ হাউস গ্রাহকদের লেনদেনের তথ্য ই-মেইল বা এসএমএসের মাধ্যমে পাঠায় না।

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার এসব দুর্বলতা জালিয়াতির ঝুঁকি বাড়ায়। শুধু সফটওয়্যার পরিবর্তনের নির্দেশ দিলেই হবে না; তা বাস্তবে যথাযথভাবে কার্যকর হয়েছে কি না, সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার।

এ বিষয়ে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ার বলেন, ‘অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের জালিয়াতি প্রতিরোধে ডিএসই একটি বিশেষ সফটওয়্যার তৈরি করছে, যা চালু হলে কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট (সিসিএ) রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিদিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাবের সমন্বয় (রিকনসিলিয়েশন) করা যাবে।’

তার মতে, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানের তথ্যে অমিল ধরা পড়লে সিস্টেম তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা দেবে। ফলে দ্রুত জবাবদিহি নিশ্চিত ও আকস্মিক পরিদর্শন চালানো সম্ভব হবে।’

শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েও টাকা ফেরত অনিশ্চিত

সাতটি ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নিয়েছে। মশিউর সিকিউরিটিজে ১৬১ কোটি টাকার ঘাটতি ধরা পড়ার পর প্রতিষ্ঠানটির লেনদেন ও ডিপি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

তামহা সিকিউরিটিজের কার্যক্রম ২০২১ সালের নভেম্বরে বন্ধ করে দেয় ডিএসই। বিএসইসির তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. হারুনুর রশীদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে প্রায় দুই হাজার বিনিয়োগকারীর অর্থ আত্মসাতের তথ্য পাওয়া যায়। পরে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট তাদের একাধিক ব্যাংক হিসাব জব্দ করে।

সালতা ক্যাপিটালের সিসিএতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ডিএসইর আকস্মিক পরিদর্শনে ঘাটতি ধরা পড়ে। পরবর্তী তদন্তে ১০০ কোটি ৫২ লাখ টাকার শেয়ার ও অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়। ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধেও বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বাংকো সিকিউরিটিজের কার্যক্রমও ২০২১ সালে বন্ধ করা হয়। শাহ মোহাম্মদ সগীর সিকিউরিটিজের ট্রেডিং রাইটস এনটাইটেলমেন্ট (টিআরই) সনদ ২০১৯ সালে স্থগিত করে ডিএসই। ব্লু চিপ সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধেও গ্রাহকের শেয়ার বিক্রি, চেক ডিজঅনার ও অর্থ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে মামলা চলছে।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আল-আমিন বলেন, ‘যেসব ব্রোকারেজ হাউস গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ করেছে, তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে মামলা চলমান থাকায় সেই অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্ষীণ। একই সঙ্গে ইনভেস্টর প্রটেকশন ফান্ডে থাকা অর্থও ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণের জন্য পর্যাপ্ত নয়।’

তার মতে, ‘আইনি ও আর্থিক জটিলতার নিষ্পত্তি না হলে এসব ব্রোকারেজ হাউস বিক্রিও সহজ হবে না। তাই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে।’

বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, ‘ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কমিশন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রমও চলছে। আত্মসাৎ করা অর্থ বিনিয়োগকারীদের ফেরত দিতে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

যেভাবে হবে নতুন ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি

নতুন ব্যবস্থায় আট সদস্যের যৌথ কমিটিতে বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই ও সিডিবিএলের দুজন করে প্রতিনিধি থাকবেন। কমিটি গঠনের পর ব্রোকারেজ হাউস ও স্টক ডিলারদের বিভিন্ন কার্যক্রম আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করা হবে। পরিদর্শনের সময় বিশেষভাবে ব্রোকারেজ হাউসের কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট (সিসিএ), নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান পরিপালন, মার্জিন ঋণসংক্রান্ত নিয়ম এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।

বিএসইসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরিদর্শনের দিন সকালে কর্মকর্তারা কমিশনের কার্যালয়ে মিলিত হবেন। এরপর সন্দেহজনক কার্যক্রম, সম্ভাব্য অনিয়ম ও অন্যান্য ঝুঁকি সূচকের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ব্রোকারেজ হাউসের তালিকা থেকে একটি প্রতিষ্ঠান বাছাই করা হবে। এরপর পরিদর্শন দলকে নির্বাচিত ব্রোকারেজ হাউসের কাছাকাছি এলাকায় পাঠানো হবে। সেখানে পৌঁছানোর পর বিএসইসি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে তাৎক্ষণিক পরিদর্শনের চিঠি দেবে। এরপর পরিদর্শন দল ওই প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে গিয়ে কার্যক্রম শুরু করবে। এভাবে পরিদর্শনের আগে প্রতিষ্ঠানটিকে খুব বেশি সময় না দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে নথি পরিবর্তন, সফটওয়্যারে কারসাজি কিংবা অনিয়ম আড়াল করার সুযোগ কমবে বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

এ বিষয়ে বিএসইসির একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করে জানান, ব্রোকারেজ হাউসের অনিয়ম ও গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এতে পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সক্রিয় বিনিয়োগকারীর সংখ্যাও কমেছে। এ অবস্থায় ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ওপর নিয়মিত ও ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে অনিয়ম শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ সুরক্ষিত রাখাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।