সুপ্রভাত ডেস্ক »
মানচিত্রের সীমারেখা অপরিবর্তিত থাকলেও বদলে গেছে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-অর্থনৈতিক বাস্তবতা। দীর্ঘ কয়েক দশকের প্রথা ভেঙে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল থেকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (এমইএনএ) অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে বিশ্বব্যাংক।
বৈশ্বিক এ ঋণদাতার নতুন এ কাঠামোগত বিন্যাসে জন্ম নিয়েছে ‘বৃহৎ মধ্যপ্রাচ্য’ বা ‘এমইএনএএপি’ নামের নতুন এক অর্থনৈতিক বলয়। মূলত বৈদেশিক মুদ্রার উৎস, উপসাগরীয় দেশগুলোর শ্রমবাজারের ওপর অতিনির্ভরতা এবং জ্বালানি আমদানির ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনা করেই এ কৌশলগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি বিশ্বব্যাংক চলতি মাসেই ঘোষণা দিয়েছে। যদিও ২০২৫ সালের জুলাই থেকে এ আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাস কার্যকর হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে, যেখানে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কমে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগ আরো জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান এ অঞ্চল থেকে ভূ-অর্থনৈতিকভাবে সরে যাওয়ায় আঞ্চলিক ভারসাম্য ভারতের দিকে আরো ঝুঁকতে পারে। এতে এ অঞ্চলের সমন্বিত অর্থনৈতিক উদ্যোগ আরো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তার বণ্টনেও পুনর্বিন্যাস হতে পারে, যেখানে বাকি দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
এছাড়া বিশ্বব্যাংকের এ সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়াকে একটি কম সংহত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত করতে পারে, যেখানে দেশভিত্তিক কৌশলই বেশি প্রাধান্য পাবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
বিশ্বব্যাংকের এ আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাসের পেছনে ভৌগোলিক যুক্তির চেয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্কই প্রাধান্য পেয়েছে। ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থিত। এর সীমানা ভারতের পাশাপাশি আফগানিস্তান ও ইরানের সঙ্গে সংযুক্ত, আর দক্ষিণে রয়েছে আরব সাগর।
কৌশলগত ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে ইসলামাবাদকে প্রায়ই ‘বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য’ বা এমইএনএএপি কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হয়। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হলেও পাকিস্তানকে এখন ক্রমবর্ধমানভাবে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক প্রভাব বলয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো উৎপাদনভিত্তিক বা রফতানিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে না পারায় পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই বৈদেশিক মুদ্রার জন্য বিকল্প পথ খুঁজে এসেছে। সে বিকল্প পথ হয়ে উঠেছে উপসাগরীয় অঞ্চল। বিশেষ করে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত। এ দুই দেশের শ্রমবাজারে বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানি কর্মরত। যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স পাকিস্তানের অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।
একই সঙ্গে তেল-গ্যাস আমদানির জন্যও পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল, ফলে জ্বালানি বাজারের ওঠানামা সরাসরি দেশটির অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। এ নির্ভরতা পাকিস্তানকে ধীরে ধীরে এমন এক অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে ঠেলে দিয়েছে, যাকে দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে অনেক বেশি সাযুজ্যপূর্ণ বলেই মনে করেছে বিশ্বব্যাংক।
এমনকি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে গিয়ে পাকিস্তান বারবার গালফ দেশগুলোর কাছ থেকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। যা কখনো ডিপোজিট, কখনো ঋণ, কখনো বা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে এসেছে। এ সহায়তা সংকটকালে পাকিস্তানের রিজার্ভ টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে পাকিস্তানের অর্থনীতির ‘কেন্দ্রীয় ভার’ ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়া থেকে সরে গিয়ে গালফ অঞ্চলে স্থির হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পুনর্বিন্যাসের ভূরাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। দক্ষিণ এশিয়া ঐতিহাসিকভাবে মূলত ভারতকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিসরে আবর্তিত হয়েছে। যেখানে আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও প্রতিযোগিতা সবকিছুতেই কেন্দ্রে ছিল ভারত। পাকিস্তান এ কাঠামোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে ছিল। অন্যদিকে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য ভিন্ন ধরনের শক্তি কেন্দ্র, যেখানে তেলভিত্তিক অর্থনীতি, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল এবং কৌশলগত বিনিয়োগ বড় ভূমিকা রাখে। এ অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া মানে পাকিস্তানের জন্য নতুন বৃত্তে প্রবেশ করা, যেখানে অর্থনৈতিক সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকিও বাড়বে।
কেজ বিজনেস স্কুল এবং জিওপলিটিক্স স্ট্র্যাটেজি ল্যাবের (ফ্রান্স) প্রধান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ এম জসীমউদ্দীন বলেন, ‘পাকিস্তানের এ আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাস দক্ষিণ এশিয়ার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব বয়ে আনতে পারে। বিশেষ করে আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো হিসেবে সার্ককে এগিয়ে নেয়ার যে সুযোগ ছিল, তা আরো ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও অর্থনৈতিক সংযোগ জোরদারের যে সম্ভাবনা ছিল, পাকিস্তানের অতিরিক্তভাবে গালফমুখী হওয়ায় তা দুর্বল করে দিতে পারে। তবে পাকিস্তানের জন্য এতে কিছু নতুন সুযোগও তৈরি হচ্ছে, বিশেষ করে গালফভিত্তিক বিনিয়োগ ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই জটিল। পাকিস্তান নিজেই প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক তৈরি করে রেখেছে। নতুন এ আঞ্চলিক গোষ্ঠীতে দুই দেশ কতটা কার্যকরভাবে সমন্বয় করতে পারবে, সেটিও অনিশ্চিত। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান আপাতত ‘হোস্ট’-এর ভূমিকায় রয়েছে। তবে অঞ্চলটিতে যে নতুন মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে পাকিস্তানের এ অবস্থান সেটিরই একটি প্রতিফলন। এ প্রক্রিয়া কতটা গভীর হবে এবং এতে পাকিস্তান কতটা কার্যকর কৌশলগত ভূমিকা নিতে পারবে, তা নির্ভর করবে সময় ও বাস্তব ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।’
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ নতুন অবস্থানের ফলে পাকিস্তানের সুবিধা-অসুবিধা দুটোই রয়েছে। প্রথমত, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল আর্থিক সম্পদ পাকিস্তানের জন্য বড় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়লে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন পথ খুলতে পারে। দ্বিতীয়ত, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গভীরতা বাড়ার ফলে বাণিজ্য ও শ্রমবাজারে আরো সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহকে স্থিতিশীল রাখবে। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের নতুন কর্মসূচির আওতায় পাকিস্তানের জন্য বড় অংকের উন্নয়ন সহায়তার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
তবে এ পরিবর্তনের সঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকিও যুক্ত রয়েছে। গালফ অঞ্চলের অর্থনীতি তেলের দামের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল, ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পাকিস্তানের ওপর পড়বে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তবে আরেকটি বড় উদ্বেগের কারণও রয়েছে। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাংক দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। একই বছর মধ্যপ্রাচ্য-নর্থ আফ্রিকা (এমইএনএ) অঞ্চলে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। টাকার অংকে এ ফারাক বিশাল।
পাকিস্তান যদি এ নতুন গ্রুপে থাকে এবং এ বরাদ্দ বণ্টনের ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে বিশ্বব্যাংকের সরাসরি আর্থিক সহায়তা কমে আসার আশঙ্কা আছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসরকারি বিনিয়োগ ও তহবিলের অর্থ দিয়ে সেই ঘাটতি পোষানো যাবে কিনা, সেটিও অনিশ্চিত। বিশ্বব্যাংক পাকিস্তানকে দক্ষিণ এশিয়া থেকে গালফ অঞ্চলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়ার সমসাময়িক সময়েই রিয়াদ জানিয়েছে, পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংকে রাখা বিদ্যমান ৫ বিলিয়ন ডলার ডিপোজিটের মেয়াদ বাড়ানো হবে এবং নতুন করে আরো ৩ বিলিয়ন ডলার যোগ করা হবে। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশে এ সহায়তা দেয়া হচ্ছে বলে সৌদি প্রেস এজেন্সি জানিয়েছে।
বিশ্বব্যাংক পাকিস্তানকে এমইএনএএপি অঞ্চলে স্থানান্তর করায় দক্ষিণ এশিয়ার ওপর আরো বেশকিছু প্রভাব পড়বে। প্রথমত, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামো আরো একপক্ষীয় হয়ে উঠতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় এরই মধ্যে ভারতের প্রাধান্য রয়েছে, সেখানে পাকিস্তানের কার্যকর সরে যাওয়া আঞ্চলিক ভারসাম্যকে আরো ভারতের দিকে ঠেলে দেবে। ফলে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ব্লক হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থান আরো দুর্বল ও অসম হয়ে পড়তে পারে।
এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তর্জাতিক সহায়তা ও অর্থায়নের কাঠামো বদলাতে পারে। আগে পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার গ্রুপের অংশ হিসেবে যে পরিমাণ উন্নয়ন সহায়তা বা ফোকাস পেত, এখন তা আলাদা হয়ে যাওয়ায় বাকি দেশগুলোর মধ্যে সেই বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস হতে পারে। এতে কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলংকার মতো দেশ বেশি সুযোগ পেতে পারে। এছাড়া ভূরাজনৈতিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচয় আরো দুর্বল হতে পারে।
পাকিস্তানের মতো একটি বড় দেশ কার্যত আলাদা অর্থনৈতিক ব্লকে চলে যাওয়ায় এ অঞ্চল একটি কম সংহত অঞ্চল হিসেবে দেখা দিতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক ব্লগে সংস্থাটির অর্থনীতিবিদ ড্যানিয়েল বোলার, হারুনা কাশিওয়াসে, সিনায়ে লি ও এরিক মেত্রো লিখেছেন, দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাসের ফলে জনসংখ্যার আকারে পরিবর্তন দেখা গেছে।
পুনর্বিন্যাসের আগে যেখানে এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২০০ কোটি, তা নতুন কাঠামোয় কমে প্রায় ১৭০ কোটিতে নেমে এসেছে। তবে জনসংখ্যার অংশীদারত্বে পরিবর্তন তুলনামূলক কম। আগে ভারতের অংশ ছিল ৭৫ শতাংশ, যা এখন বেড়ে ৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলংকা, ভুটান ও মালদ্বীপের অংশ সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পরিবর্তনের প্রভাব জনসংখ্যাভিত্তিক বিভিন্ন সূচকেও পড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণনির্ভরতা অনুপাত ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বয়স্কনির্ভরতা অনুপাত কিছুটা বেড়েছে।

















































