সুপ্রভাত ডেস্ক »
এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হওয়ায় বাংলাদেশসহ পূর্ব আফ্রিকা ও এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে আগামী কয়েক সপ্তাহে বন্যা, ভূমিধস, তাপপ্রবাহ, খরা এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি বাড়বে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি)।
গতকাল সোমবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, কেনিয়া, উগান্ডা, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের লাখো মানুষ এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে চলতি মৌসুমি বৃষ্টিতেই প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে।
আইআরসি জানায়, চলতি বছরের মৌসুমি বৃষ্টিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় ভূমিধস ও বন্যায় অন্তত ১৫ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। জুলাই মাসের শুরু থেকে ১০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
অন্যদিকে পাকিস্তানে মৌসুমি বৃষ্টি স্বাভাবিকের চেয়ে কম হতে পারে এবং তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তবে দেশটির উত্তরাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ গলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। আফগানিস্তানে গড়ের চেয়ে বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকায় দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
পূর্ব আফ্রিকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে আইআরসি। সংস্থাটির তথ্যমতে, সোমালিয়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গড়ের চেয়ে বেশি বৃষ্টির—৬০ শতাংশ—সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘদিনের খরা ও বাস্তুচ্যুতির সংকটে দেশটিতে বর্তমানে ৪৮ লাখ মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। এল নিনোজনিত বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
আইআরসি স্মরণ করিয়ে দেয়, ২০২৩ সালের বন্যায় সোমালিয়ায় প্রায় ১৩ হাজার টন ফসল নষ্ট হয়েছিল এবং বহু শহর ও জনপদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবার একই ধরনের বন্যা হলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি হতে পারে। কারণ, মানুষ ইতিমধ্যে খরা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
এ ছাড়া ইথিওপিয়ার উঁচু এলাকায় ভারী বৃষ্টি এবং সোমালিয়ার দেইর মৌসুমের বৃষ্টির কারণে দেশটির প্রধান দুই নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে পানির উৎস দূষিত হয়ে কলেরা ও তীব্র পানিজনিত ডায়রিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
কেনিয়ায় ২০২৬ সালজুড়ে এল নিনো পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা ৮০ থেকে ৮২ শতাংশ। বছরের শেষ দিকে সেখানে বন্যা ও ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকির কারণে সরকার ইতিমধ্যে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা কাঠামো সক্রিয় করেছে। উগান্ডাতেও বছরের শেষ প্রান্তিকে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। আগের এল নিনো চক্রে দেশটিতে ৪ লাখ ১৩ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন।
আইআরসির জরুরি কার্যক্রমবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট বব কিচেন বলেন, ‘একই সময়ে একাধিক সংকট তৈরি হচ্ছে। যেসব জনগোষ্ঠীর নতুন কোনো ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা সবচেয়ে কম, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। বৃষ্টি ও দুর্যোগ শুরু হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া মানুষের সবকিছু হারানোর পর সহায়তা দেওয়ার চেয়ে অনেক কম ব্যয়বহুল এবং অনেক বেশি মানবিক।’
এল নিনোর প্রভাব আরও জোরালো হওয়ার প্রেক্ষাপটে আইআরসি দাতা সংস্থা ও বিভিন্ন সরকারের প্রতি পূর্ব আফ্রিকা ও এশিয়ায় আগাম দুর্যোগ প্রস্তুতি কার্যক্রমে এখনই আরও অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, দুর্যোগ আঘাত হানার আগে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে নগদ সহায়তা, বিশুদ্ধ পানি ও আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং মানুষের দুর্ভোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে কেন এত বৃষ্টি
৫ জুলাই থেকে বাংলাদেশে ব্যাপক বৃষ্টি শুরু হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মাসের ১১ দিনে মোট বৃষ্টির ৭৫ শতাংশ হয়ে গেছে।
আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, এবার নিম্নচাপের পাশাপাশি এত বৃষ্টির আরেকটি কারণ ছিল মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় অবস্থান। মৌসুমি বায়ু এবার স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত সাত দিন পরে এসেছে। জুন মাসে কম বৃষ্টি হলেও জুলাইয়ের প্রথম দিকেই মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাতেই এ বৃষ্টি হয়।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ গত এক সপ্তাহের বেশি বৃষ্টির আরও দুটি কারণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রথম কারণ হলো সাগরে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপের ভিন্ন গতি। তিনি বলেন, এবার নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছিল উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে। স্বাভাবিকভাবে এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা ও বরিশাল হয়ে মধ্যাঞ্চলের ঢাকা বিভাগ পার হয়ে চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এবার জলীয় বাষ্পপূর্ণ এ বাতাস দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল বা চট্টগ্রাম বিভাগমুখী হয়েছে। এ কারণে ওই অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত বেশি বৃষ্টি হয়েছে।
চলতি বছরের গ্রীষ্ম অনেক বেশি উষ্ণ হতে পারে বলে সতর্কতা করেছিল বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। এর কারণ হলো এল নিনোর প্রভাব। প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই বায়ুপ্রবাহের আধিক্য দেখা দিলে উষ্ণতা বাড়ে। দেখা গেছে, পুরো ইউরোপে এবার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক গরম পড়েছে। উত্তর আমেরিকার অনেক দেশেও এ অবস্থা।
বজলুর রশীদ বলছিলেন, এল নিনোর আরেকটি বিপরীতমুখী প্রবণতা হলো অল্প সময়ে অধিক বৃষ্টি। তাতে সাময়িক প্রশমন ঘটে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এবার যে বৃষ্টি, তা এল নিনোর বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া বলা যেতে পারে।
এবারের বৃষ্টিতে দেশে এক লাখ হেক্টরের বেশি জমি প্লাবিত হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গতকাল সোমবার তাদের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে।















































