
নিজস্ব প্রতিবেদক »
নগরের বায়েজিদ লিংক রোডে অবস্থিত বিশ্বমানের সাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সাজিনাজ হসপিটালে বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে চট্টগ্রাম প্রাইভেট হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিকস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে সভাপতিত্ব করেন মেট্রোপলিটন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি ডা. এ কে এম ফজলুল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাজিনাজ হসপিটালের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম।
সভায় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহ সভাপতি ডা. এটিএম রেজাউল করিম, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. আব্দুল মোত্তালিব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. এস এম সরোওয়ার আলমসহ অ্যাসোসিয়েশনের সকল সদস্যবৃন্দ এবং সকল হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিবৃন্দ।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, চট্টগ্রামের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার জন্য সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে। সঠিক রোগ নিরূপন ও চিকিৎসাসেবা দিতে আমরা বদ্ধ পরিকর। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ হাজার রোগিকে চিকিৎসা পরামর্শ ও সেবা দিয়ে আসছে। হাসপাতালগুলো সঠিক ও রোগীবান্ধব সেবা প্রদান করলেও মাঝে মাঝে কিছু দুর্ঘটনার কারণে ডাক্তারসহ সেবা প্রদানকারী স্বাস্থ্যকর্মীরা হেনস্থার শিকার হন। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতাল পরিচালনা কঠিন ও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।
সাজিনাজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষকে সেবা দেওয়ার ব্রত নিয়েই ২০২৪ সালের মে মাসে এই হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। সুচিকিৎসা ও মানসম্মত সেবা দিতে আমরা সবসময় প্রস্তুত। এই পর্যন্ত আমরা প্রায় ১০ হাজার ভর্তি রোগিসহ ৩২হাজার রোগিকে চিকিৎসাসেবা দিয়েছি। মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে শোকরিয়া আদায় করছি যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের এই হাসপাতালের মাধ্যমে ১০ হাজার পরিবারে হাসি ফোটানোর সুযোগ করে দিয়েছেন। ইতোমধ্য এই হাসপাতাল রোগিদের আস্থার জায়গায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একজন শিশুর মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাসপাতালের নামে ও স্বনামধন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা হয়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। ব্যাপারটি তদন্তাধীন এবং এ ব্যাপারে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর জন্য সবাইকে অনুরোধ করছি।’
তিনি বলেন, ডাক্তার রোগের চিকিৎসা করেন, মৃত্যুর নয়। হাসপাতালগুলো ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী রোগিকে সেবা দিয়ে থাকে যাতে করে রোগি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারেন। কিন্তু কখনো কখনো দেখা যায়, রোগির মৃত্যু হলে তার দায়ভার ডাক্তার এবং হাসপাতাল কর্তপক্ষকে দেওয়া হয়, যা অনাকাক্সিক্ষত। তিনি এ ব্যাপারে সবাইকে সহনশীল হওয়ার আহবান জানান।
শিশু মৃত্যুর অভিযোগের ব্যাখ্যা
সাজিনাজ হাপাতালে চিকিৎসাধীন একটি শিশুকে পরবর্তীতে ঢাকার একটি হাসপাতালে স্থানান্তরের পর মৃত্যুর ঘটনার বিষয়ে সাজিনাজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘হসপিটালের ম্যানেজমেন্ট এবং হসপিটালের ডাক্তারদের থেকে কোনোরকম অবহেলা ছিল না। এটা ছিল ঈদুল আজহার সময়। এ সময়ে কনসালট্যান্ট পাওয়াটা একটু জটিল হয়ে যায়।
অভিযোগে ডা. ফয়সালের নাম বার বার আসছে। তিনি চট্টগ্রামের একজন সিনিয়র প্যাডিয়াট্রিক কনসালটেন্ট। উনি এ বাচ্চাটাকে প্রথম দিন দেখেন। বাচ্চাটা অন্য একটা হসপিটাল থেকে আমাদের হসপিটালে আসে। শ^াসজনিত জটিলতা নিয়ে। যে হাসপাতালে শিশুটির জন্ম হয় সেখানে এ সমস্যার উচ্চতর চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকার কারণে অথবা লাইফ সাপোর্ট লাগতে পারে এ সন্দেহে আমাদের এ হসপিটালে রেফার করা হয়। এখানে আসার পরে ডা. ফয়সাল বাচ্চাটিকে দেখেন এবং যাবতীয় চিকিৎসাসেবা দেন। এরমধ্যে ঈদুল আজহার বন্ধ, ডা. ফয়সালের এর আগে থেকেই ছুটিতে যাওয়ার কথা ছিল, সে হিসেবে উনি অপর সিনিয়র প্যাডিয়াট্রিক কনসালটেন্ট ডা. আনোয়ারকে দায়িত্ব দিয়ে ছুটিতে যান। ডা. আনোয়ার এ বাচ্চাকে দেখাশোনা ও চিকিৎসা শুরু করেন।
এ বাচ্চা ২৫ মে রাতে এখানে ভর্তি হয় এবং ১ জুন পর্যন্ত এ বাচ্চা আমাদের হসপিটালে অবস্থান করে। ডা. আনোয়ারের তত্বাবধানে ২৬ তারিখে চিকিৎসা শুরু হয় এবং ২৭, ২৮ তারিখের মধ্যে বাচ্চার শ^াসকষ্টজনিত সমস্যার রিমার্কএবল উন্নতি হয়। এটাই বাচ্চাটির মূল সমস্যা ছিল। এ সমস্যা নিয়ে এখানে ভর্তি করানো হয়।
এরপর বাচ্চাটিকে কেবিনে বা ওপেন রাখার কথা ভাবা হয়, কারণ বাচ্চাটি তখন স্বাভাবিকভাবে শ^াস নেওয়ার উপযোগী ছিল। এ বাচ্চা যখন আমাদের এখানে আসে তখন তার বাম হাতে ক্যানোলা ছিল। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী, আমরা পুরোনা ক্যানোলা খুলে ডান হাতে এবং দুই পায়ে ক্যানোলা করি এবং এই ক্যানোলার মাধ্যমে পুরো চিকিৎসাটা কনটিনিউ হয়। বাম হাতের ক্যানোলার ওই জয়গায় প্রথম দিন থেকেই কিছুটা ফোলা ভাব ছিল, আমাদের ডক্টররা এ ব্যাপারে চিকিৎসা দিয়েছেন, যতটুকু আমি জানি।
কিন্তু ৩০ তারিখ (৩০ মে) রাতে এ ফোলা ভাবটার একটু অবনতি ঘটে। পরদিন সকালে ডক্টর ফয়সাল ছুটি শেষে ফিরে আসেন এবং তিনি বাচ্চাটির অবস্থার দেখার ভিত্তিতে সাতজন কনসালটেন্ট মিলে গঠিত বোর্ডের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয়, যেহেতু চট্টগ্রামে ভাসকুলার সার্জারি বা ভাসকুলার রি-কনস্ট্রাকশন রিলেটেড সার্ভিসগুলো একটু লিমিটেড তাই বাচ্চাটিকে যদি ঢাকায় পাঠানো হয় তাহলে তার অবস্থার উন্নতি হতে পারে। সে হিসেবে ডা. ফয়সাল, মেডিকেল বোর্ড বাচ্চাটিকে ঢাকায় এভারকেয়ার হসপিটালে রেফার করেন , যাতে ঈদের ছুটির কারণে অন্য কোথাও ডক্টরের সংকট বা কনসালটেন্টের অপ্রতুলতার জন্যে চিকিৎসাসেবায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।
সে হিসেবে ঢাকা এভারকেয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে রোগিকে সেখানে রেফার করা হয় এবং রোগিকে আমরা আইসিইউ, অ্যাম্বুলেন্স থেকে শুরু করে সব কিছু সেট করে দেই। কিন্তু আমাদের এখান থেকে যাওয়ার সময়ে হয়তোবা রোগির কোনো এটেনডেন্ট অথবা বাবা-মায়ের মনে হয়েছে তারা ইবনে সিনায় চিকিৎসাসেবা নেবে। পরে আমরা যেটা খবর পেয়েছি , ফেসবুক অথবা বিভিন্ন মাধ্যমে, রোগি ইবনে সিনায় যায় এবং পরবর্তীতে এভারকেয়ারে যায়। ইবনে সিনা এবং এভারকেয়ারে কি চিকিৎসা চলমান ছিল সে ব্যাপারে আসলে আমাদের অফিসিয়াল কোনো তথ্য নেই।
শেষ পর্যন্ত এ বাচ্চাটা বেঁেচ নেই এ খবর শুনে আমরা হসপিটাল কর্তৃপক্ষও মর্মাহত। কিন্তু এ ঘটনার জেরে, সোস্যাল মিডিয়া অথবা বিভিন্ন মাধ্যমে এ নিউজটা যেভাবে ছড়িয়েছে তাতে ডক্টর ফয়সালসহ আরো সাতজন অভিজ্ঞ কনসালটেন্ট ব্যক্তিজীবনে মানসিকভাবে কেউ-ই ভালো নেই। এ অবস্থায় ওনাদের পক্ষে জটিল রোগির চিকিৎসাসেবা দেওয়াও কঠিন হয়ে যাবে।
মেডিক্যাল বোর্ড গঠন হয়েছে। সিভিল সার্জন অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে কমিটি করে দিয়েছেন। ওনারা তদন্ত করে রিপোর্ট দেবেন। এরপর আমরা জানতে পারবো, এখানে কার কি ভুল হয়েছে, কোনো অবহেলা ছিল কিনা।
আমি সবাইকে অনুরোধ করবো, এ ধরনের ঘটনা যখন ঘটে যেহেতু এগুলো স্পেশাল টেকনিক্যাল বিষয় তাই টেকনিক্যাল বোর্ডের সিদ্বান্ত ছাড়া সাধারণ মানুষ যাতে ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে ঘটনা বিশ্লেষণ, ডাক্তারদের পারসোনাল লাইফ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকে সে ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি এবং ডাক্তাররা যাতে অহেতুক বিড়ম্বনার শিকার না হন, ভয়-ভীতির উর্ধ্বে উঠে তাদের চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে পারেন সেই সহযোগিতা করবেন।

















































