মতামত সম্পাদকীয়

ঝুঁকিতে লাখো রোহিঙ্গা : বর্ষার প্রাক্কালে প্রয়োজন জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ

বর্ষা শুরু হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সামনের দিনগুলোতে বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন এলাকায় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অতিবর্ষণ বা ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এই প্রাকৃতিক পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জীবনে যেমন স্বস্তি ও উদ্বেগ দুই-ই বয়ে আনে, তেমনি কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে থাকা প্রায় ১২ লাখেরও বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য তা ডেকে আনে চরম মানবিক বিপর্যয়। পাহাড়ের ঢালুতে তৈরি অস্থায়ী প্লাস্টিক ও বাঁশের তৈরি খুপরিতে থাকা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন এখন আক্ষরিক অর্থেই প্রকৃতির দয়ার ওপর নির্ভরশীল।
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। বছরের পর বছর ধরে পাহাড় কেটে তৈরি করা এই বসতিগুলো ভারী বৃষ্টির ফলে তীব্র ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, সামান্য অতিবর্ষণেও কীভাবে পাহাড় ধসে বহু প্রাণহানি ঘটেছে। একই সাথে ক্যাম্পগুলোর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অপ্রতুল হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়। নোংরা ও দূষিত পানি জমে যাওয়ার ফলে ডায়রিয়া, ডেঙ্গু ও কলেরার মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় দ্রুত, যা ঘনবসতিপূর্ণ এই ক্যাম্পে মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।
শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগই নয়, বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে। কাদা আর ধসে পড়া মাটির কারণে ত্রাণবাহী যানবাহন বা জরুরি চিকিৎসা সেবা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদের দুর্ভোগ এই সময়ে চরম রূপ নেয়।
এই মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় কেবল বাংলাদেশ সরকারের একার প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে রোহিঙ্গাদের সরিয়ে নেওয়ার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রশংসনীয়। তবে দুর্যোগের তীব্রতা বাড়লে এই সাময়িক প্রস্তুতি অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হতে পারে।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ও সমন্বিত অংশগ্রহণ। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এখনই ক্যাম্পগুলোর অবকাঠামোগত সংস্কার, শক্তিশালী ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং পাহাড়ের ঢালু রক্ষায় জরুরি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং জরুরি ওষুধপত্রের মজুত নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যেন যেকোনো দুর্যোগে তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করা যায়।
রোহিঙ্গাদের এই দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বাংলাদেশের পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে। বর্ষার এই মানবিক সংকট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই সমস্যার একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন। আন্তর্জাতিক মহলের উচিত কেবল বর্ষাকালীন ত্রাণের দিকে নজর না দিয়ে, মিয়ানমার সরকারের ওপর কূটনৈতিক চাপ জোরালো করা। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে লাখো রোহিঙ্গার জীবন রক্ষা করা যেমন আমাদের দায়িত্ব, তেমনি এই সংকটের একটি স্থায়ী ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা আজ সময়ের দাবি।

-advertise-