মতামত সম্পাদকীয়

আরও রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ কী হতে যাচ্ছে তবে

ফাইল ছবি

গত ১৬ মাসে দেশে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গার প্রবেশ কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জন্য এক অশনিসংকেত। ইউএনএইচসিআর-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে আসা এই তথ্য আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর নতুন করে চাপের সৃষ্টি করেছে। ২০১৭ সালের মানবিক বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশ বুক পেতে গ্রহণ করেছিল লাখ লাখ নির্যাতিত মানুষকে। কিন্তু দীর্ঘ সাত বছরেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া এবং নতুন করে এই বিশাল জনস্রোতের প্রবেশ পরিস্থিতিকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সামরিক জান্তা এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরকান আর্মির মধ্যে চলমান তীব্র সংঘর্ষই এই নতুন করে প্রাণভয়ে পালিয়ে আসার মূল কারণ। যুদ্ধের দাবানলে পিষ্ট হয়ে সাধারণ রোহিঙ্গারা আবারো সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা সত্ত্বেও নাফ নদী এবং স্থলসীমানা দিয়ে এই বিশাল সংখ্যক মানুষের প্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। এটি আমাদের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন তোলে, তেমনি প্রমাণ করে যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট এখন সরাসরি বাংলাদেশের ওপর উপচে পড়ছে।
ইতোমধ্যেই প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা টেকনাফ ও উখিয়ার ক্যাম্পগুলোতে গাদাগাদি করে বসবাস করছে। নতুন করে আসা দেড় লাখ মানুষের চাপ সামলানো আমাদের মতো সীমিত সম্পদের দেশের জন্য প্রায় অসম্ভব।
পাহাড় কাটা এবং বন উজাড়ের ফলে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ইতোমধ্যে ধ্বংসের মুখে। নতুন বসতি স্থাপন এই বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করবে। ক্যাম্পগুলোতে মাদক চোরাচালান, মানব পাচার এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ এই অস্থিরতাকে আরও উসকে দিচ্ছে, যা স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। বিশ্বজুড়ে অন্যান্য সংকটের কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য আসা আন্তর্জাতিক সাহায্যের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমছে। ফলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভরণপোষণের সিংহভাগ ভার বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরই পড়ছে।
সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা। মুখে সমবেদনা প্রকাশ করলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টিতে বিশ্বনেতারা চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। চীনের মধ্যস্থতায় প্রত্যাবাসন শুরুর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, রাখাইনের বর্তমান অস্থিরতায় তা-ও স্থবির হয়ে পড়েছে। পশ্চিমাবিশ্ব কিংবা প্রতিবেশী দেশগুলো মানবিক সহায়তার কথা বললেও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথে হাঁটছে না।
বাংলাদেশকে এখন দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বন করতে হবে। প্রথমত, সীমান্তে নজরদারি আরও কঠোর করতে হবে যাতে নতুন করে কোনো অনুপ্রবেশ না ঘটে। প্রয়োজনে ড্রোন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মহলে এই নতুন সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। জাতিসংঘ ও প্রভাবশালী দেশগুলোকে পরিষ্কারভাবে বলতে হবে যে, বাংলাদেশ আর এককভাবে এই বোঝা বইতে সক্ষম নয়।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কেবল বাংলাদেশে তাদের আশ্রয় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর স্থায়ী সমাধান নিহিত রয়েছে মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের মধ্যে। বিশ্ববিবেক যদি এখনই জাগ্রত না হয়, তবে এই সংকট কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করে তুলবে।