সুপ্রভাত ডেস্ক »
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামীণ সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে সরকারি অর্থায়নে লাগানো বিভিন্ন প্রজাতির বড় বড় গাছ একে একে কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, ঈদুল আজহার ছুটির সুযোগে সড়কের দুই পাশ থেকে অন্তত ২১টি পরিণত বৃক্ষ কেটে বিক্রি করা হয়েছে। এসব গাছের আনুমানিক বাজারমূল্য ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা হতে পারে বলে ধারণা করছেন এলাকাবাসী।
ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দিনের আলোতেই গাছগুলো কেটে নিয়ে গেছে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
দুই দশকের সবুজ ছায়া হারাল সড়ক
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মুরাদপুর ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়কটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রায় ২০ বছর আগে সরকারি উদ্যোগে রাস্তার দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এসব গাছ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের তত্ত্বাবধানে ছিল।
বছরের পর বছর ধরে বেড়ে ওঠা গাছগুলো শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করেনি, বরং পথচারীদের জন্য ছায়াও দিয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি কয়েক দিনের ব্যবধানে সড়কের বিভিন্ন অংশে সারি সারি গাছ কেটে ফেলার দৃশ্য দেখে বিস্মিত হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে একাধিক স্থানে কাটা গাছের গোড়া এখনও পড়ে আছে। কোথাও কোথাও সদ্য কাটা গুঁড়ির চিহ্ন স্পষ্ট। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ গাছই ছিল পূর্ণবয়স্ক ও অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান।
গাছ কাটার প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন এলাকার ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা মো. জুনু মিয়া। তিনি বলেন, এত বড় বড় গাছ কেটে ফেলছে দেখে আমি প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলাম। তখন কয়েকজন আমাকে মারধর করে। পরে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরি। গাছগুলো তো শুধু কাঠ নয়, এগুলো আমাদের পরিবেশের সম্পদ।
জুনু মিয়ার অভিযোগ, গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি করেছে।
সবাই জানে কারা কাটছে, কিন্তু কেউ মুখ খোলে না
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এলাকাবাসীর কাছে অজানা নয়। তবে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।
তাদের দাবি, রাস্তা সংস্কার বা প্রশস্তকরণের সম্ভাব্য প্রকল্পের কথা বলে গাছ কাটার যৌক্তিকতা দেখানো হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া এমনভাবে গাছ অপসারণ আইনসম্মত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু তৈয়ব বলেন, রাস্তা প্রশস্ত করার প্রয়োজন হলে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়ম মেনে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু আগেভাগে গাছ কেটে বিক্রি করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আগে রাস্তা দিয়ে হাঁটলে গাছের ছায়া পাওয়া যেত, এখন প্রচণ্ড রোদে চলাচল করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির সময়ে একটি পরিণত গাছ কাটা মানে শুধু কাঠের ক্ষতি নয়, পরিবেশেরও অপূরণীয় ক্ষতি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং সবুজায়ন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এমন বৃক্ষনিধন পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলবে।
অভিযোগ রয়েছে, মুরাদপুর ইউনিয়ন যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. আবু জাফর ইসলাম এবং একই ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি মো. কামালের নেতৃত্বে কয়েকজন মিলে গাছগুলো কাটার কাজে জড়িত ছিলেন। তবে অভিযুক্তরা এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
আবু জাফর ইসলাম বলেন, আমাদের সাবেক সভাপতি গাছের ব্যবসা করেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার তার মাধ্যমেই শ্রমিক দিয়ে গাছ কাটাচ্ছেন। কিছু মানুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যুবদলের নাম ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
মো. কামাল বলেন, আমি কোনোভাবেই গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত নই। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল দপ্তরের তত্ত্বাবধানে ঠিকাদার কাজ করছে। দলীয় পরিচয় জড়িয়ে বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে তদন্ত হোক, সত্য বেরিয়ে আসবে।
অনুমতি দেয়নি প্রকৌশল দপ্তর
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রকৌশলী আলমগীর বাদশাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, গাছ কাটার কোনো অনুমতি আমাদের দপ্তর থেকে দেওয়া হয়নি। গাছগুলো আমাদের সম্পত্তিও নয়। রাস্তা প্রশস্তকরণের পরিকল্পনা থাকতে পারে, তবে গাছ কাটার বিষয়ে আমাদের কোনো অনুমোদন নেই।
তিনি বলেন, গাছগুলোর মালিকানা এবং কোন কর্তৃপক্ষের আওতাভুক্ত ছিল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিষয়টি নিয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিবেশকর্মী রিতু পারভী বলেন, পরিণত গাছ কেটে ফেলা মানে শুধু কয়েক লাখ টাকার কাঠ বিক্রি নয়, বরং বহু বছরের পরিবেশগত অবদান নষ্ট করা। যদি অনুমতি ছাড়া গাছ কাটা হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।স্থানীয় জনগণ চাইলে প্রশাসন, বন বিভাগ কিংবা থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে পারে। পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক প্রতিরোধও গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয়দের দাবি, গাছগুলোর প্রকৃত মালিকানা, কাটার অনুমতি ছিল কি না, কারা গাছ বিক্রি করেছে এবং বিক্রির অর্থ কোথায় গেছে, এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি।

















































