সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি সাগর উপকূলে একটি গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে আমদানিকৃত এলএনজি (লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস) বহনকারী স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৬ জন। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। ঘটনাটি নিয়ে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারি এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ কর্ম পরিবেশের উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন সাঁটিয়ে যে প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করে, তাদেরই প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা না থাকা খুব দুঃখজনক। সাম্প্রতিক এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি সীতাকুণ্ডসহ দেশের জাহাজ ভাঙা খাতজুড়ে জেঁকে বসা চরম অবহেলা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দৈন্য এবং মুনাফালোভী কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার উদাহরণ ।
কাগজে-কলমে ‘গ্রিন’ শিপইয়ার্ডের খেতাব পেলেও বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নিরাপত্তা বিধির ন্যূনতম প্রয়োগ নেই। জাহাজের স্ক্র্যাপ কাটার আগে অভ্যন্তরীণ ট্যাঙ্কগুলো সঠিকভাবে গ্যাস মুক্ত করা হয়েছে কিনা, তা পরীক্ষার আন্তর্জাতিক নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা প্রায়শই মানা হয় না। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া কেবল সামান্য মজুরির বিনিময়ে শ্রমিকদের ঠেলে দেওয়া হয় মৃত্যুর মুখে। দুর্ঘটনার পরপরই কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে চিরাচরিত ‘তদন্ত কমিটি’ গঠন করা হয়, কিন্তু কখনোই তা আলোর মুখ দেখে না। অসতর্কতা ও নিরাপত্তার খরচে ছাড় দিয়ে অধিক মুনাফা অর্জনের এই যে প্রবণতা, তা আর কেবল অবহেলা নয়—এটি এক প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক হত্যাকাণ্ড।
একটি স্থানীয় দৈনিকের তথ্য মতে, গত ১২ বছরে শিপইয়ার্ডগুলোতে ১৬০-রও বেশি শ্রমিক মারা গেছেন নানান দুর্ঘটনায়। আর পঙ্গুত্ব বরণ করে জীবন্মৃত হয়ে দিন কাটাচ্ছেন কয়েক শত মানুষ। ২০০০ সাল থেকে প্রতি বছর গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক এভাবে প্রাণ হারাচ্ছেন। কোনো বছর ফায়ার এক্সপ্লোশন, কোনো বছর বিষাক্ত গ্যাস, আবার কোনো বছর ওপর থেকে ভারী লোহার প্লেট খসে পড়ে মৃত্যু হচ্ছে শ্রমিকদের।
বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে এবং সবুজ অর্থনীতির তকমা বজায় রাখতে হলে কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক হতে হবে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রতিটি শিপইয়ার্ডে কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিক হংকং কনভেনশন অনুযায়ী জাহাজ ভাঙার প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে হবে। যেসব মালিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হবেন, তাদের নিবন্ধন বাতিলসহ ফৌজদারি অপরাধে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। কেবল নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে নিহত শ্রমিকের পরিবারের দায় শেষ করা চলবে না; শ্রমিকের জীবনের মূল্য নিশ্চিত করাই হোক বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।






















































