কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের কৃষি ও মৎস্যখাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। একদিকে পুকুর ও ঘেরের পাড় ভেঙে ভেসে গেছে কোটি টাকার মাছ, অন্যদিকে বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে তলিয়ে গেছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও মৌসুমি সবজির আবাদ।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় চট্টগ্রামের ১৫৩টি ইউনিয়নে প্রায় ১০ হাজার পুকুর ও চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া লোহাগাড়ায় ১ হাজার ৬২০টি পুকুরে ৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, কর্ণফুলীতে ৫৫৭টি পুকুরে ৬ কোটি ৮ লাখ টাকা, চন্দনাইশে ৩৮৩টি পুকুরে ৫ কোটি ৯৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, বোয়ালখালীতে ৭৫৬টি পুকুরে ৪ কোটি ৫১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা, পটিয়ায় ১ হাজার ৪৩৫টি পুকুরে ৩ কোটি ৬৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকা, ফটিকছড়িতে ৫৩৩টি পুকুরে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা, হাটহাজারীতে ১৭০টি পুকুরে ১ কোটি ৯৮ লাখ ২৭ হাজার টাকা, আনোয়ারায় ১ হাজার ১০০টি পুকুর ও ১০টি চিংড়ি ঘেরে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, সন্দ্বীপে ৪১২টি পুকুরে ১ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, মিরসরাইয়ে ৯৭টি পুকুরে ৯৮ লাখ টাকা, রাঙ্গুনিয়ায় ২৭০টি পুকুরে ৯৮ লাখ ৭ হাজার টাকা, রাউজানে ৯০টি পুকুরে ৯৩ লাখ টাকা এবং সীতাকুণ্ডে ১০টি পুকুরে ১৫ লাখ ১৪ হাজার টাকা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, এবারের বন্যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় দুর্যোগ। বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোতে ক্ষতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। এখনও অনেক এলাকায় পানি পুরোপুরি নামেনি। তাই চূড়ান্ত হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের পুনর্বাসনের জন্য ইতোমধ্যে মৎস্য অধিদপ্তরে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
কৃষিতেও বড় ধাক্কা
মৎস্য খাতের পাশাপাশি কৃষিতেও নেমে এসেছে বড় ধরনের বিপর্যয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে বন্যায় ৮ হাজার ৭৬৮ হেক্টর আউশ ধান, ৬২১ দশমিক ৬৬ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৪ হাজার ৯০৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৪ হাজার ২৯৬ দশমিক ৬৬ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
আউশ ধানের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপ উপজেলায়। এর মধ্যে বাঁশখালীতে ২ হাজার ১৫০ হেক্টর, চন্দনাইশে ২ হাজার ১২০ হেক্টর, সীতাকুণ্ডে ১ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং সন্দ্বীপে ১ হাজার হেক্টর জমির আউশ ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এছাড়া সাতকানিয়া, পটিয়া, লোহাগাড়া, বোয়ালখালী, ফটিকছড়ি, রাউজান, আনোয়ারা, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, মিরসরাই, কর্ণফুলীসহ জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও কম-বেশি আউশের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। চন্দনাইশে ৮৩০ হেক্টর, সীতাকুণ্ডে ৭০০ হেক্টর, সন্দ্বীপে ৬০০ হেক্টর, ফটিকছড়িতে ৪৭৫ হেক্টর, সাতকানিয়ায় ৪৬০ হেক্টর, পটিয়ায় ৪৫৫ হেক্টর, বাঁশখালীতে ৪০০ হেক্টর এবং রাউজানে ৩১০ হেক্টর জমির সবজি আবাদ নষ্ট হয়েছে। পাশাপাশি লোহাগাড়া, আনোয়ারা, বোয়ালখালী, কর্ণফুলী, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী ও মিরসরাইসহ অন্যান্য উপজেলাতেও বিভিন্ন মাত্রায় সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমনের বীজতলাও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানিতে তলিয়ে গেছে।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা আপ্রু মারমা জানান, বন্যার বড় আঘাত পড়েছে কৃষিখাতে। বিশেষ করে আউশ ধান ও মৌসুমি সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে পুনরায় যাচাই করে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং পুনরায় আবাদে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সহায়তার সুপারিশ করা হবে।



















































