টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও উজান থেকে নেমে আসা বন্যার পানিতে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় যে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে, তার চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক প্রাথমিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক বড় সংকটের চিত্র। বন্যায় ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির মৃত্যু এবং ৩০ কোটি ১৫ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি কেবল কিছু সংখ্যা নয়; বরং এর পেছনে জড়িয়ে আছে লাখ লাখ কৃষকের হাহাজারি, হাজারো প্রান্তিক খামারির জীবিকা, চোখের জল এবং গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার নির্মম বাস্তবতা।
এবারের বন্যায় প্রাণিসম্পদের মৃত্যুর চেয়েও বড় আঘাত এসেছে পশুখাদ্য ও খামার খাতে। ২৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকার খাদ্য নষ্ট হওয়া এবং হাজার হাজার টন খড়, কাঁচা ঘাস ও দানাদার খাদ্য বিনষ্ট হওয়া প্রমাণ করে যে, বন্যা-পরবর্তী সময়ে বেঁচে থাকা গবাদিপশুগুলোকে বাঁচিয়ে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। চারণভূমি তলিয়ে যাওয়া এবং তীব্র খাদ্য সংকটের কারণে গবাদিপশুর মধ্যে মহামারি বা অপুষ্টিজনিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ক্ষয়ক্ষতির জেলাওয়ারী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেখানে মোট ক্ষতির পরিমাণ ২৮ কোটি টাকারও বেশি। এর বাইরে কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির মতো জেলাগুলোও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। অনেক ক্ষুদ্র খামারি হয়তো ঋণ নিয়ে বা তাদের জীবনের শেষ সম্বলটুকু বিনিয়োগ করে খামার গড়ে তুলেছিলেন। এই আকস্মিক বন্যা তাদের এক নিমেষে নিঃস্ব করে দিয়েছে।
যেহেতু প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন এই হিসাবটি প্রাথমিক এবং চূড়ান্ত ক্ষতি আরও বাড়তে পারে, তাই আমাদের এখনই দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত পুনর্বাসন টেকসই করতে হবে। কেবল জরুরি খাদ্য সহায়তা বা চিকিৎসা দিয়ে এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
কাজেই, উপদ্রুত এলাকাগুলোতে অতি দ্রুত সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গবাদিপশুর দানাদার খাদ্য ও খড় সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বন্যা পরবর্তী সময়ে গবাদিপশুর মড়ক রোধে মাঠ পর্যায়ে জরুরি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠন করে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের ঘুরে দাঁড়াতে সুদমুক্ত বা স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এবং সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে পুরোপুরি রোধ করা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি ও দ্রুত পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি ও মানুষের দুর্ভোগ কমিয়ে আনা অবশ্যই সম্ভব। ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের রক্ষায় এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
মতামত সম্পাদকীয়




















































