স্বপ্ন
জিন্নাহ চৌধুরী
শুনতে পাও কি, ধ্বংসস্তূপের ভেতর
শিশুর কান্না, মায়ের নিঃশ্বাস,
রাতভর জেগে থাকা শহরের ভাঙা জানালা?
তোমাদের আকাশেও তো ভোর ওঠে
আমাদের মতোই
সূর্য কি আলাদা রঙে ওঠে সেখানে?
নাকি আলোও রক্তের গন্ধে ভারী হয়ে যায়?
যুদ্ধের আগুনে
কত নামহীন মুখ ছাই হয়ে যায়,
যাদের কোনো মানচিত্র নেই,
কোনো পতাকা নেই
শুধু ছিল বেঁচে থাকার ছোট্ট ইচ্ছে|
তোমরা শক্তি দেখাতে পারো,
আমরা জানি
কিন্তু শান্তি কি দুর্বলতা?
নাকি সেটাই সবচেয়ে বড় সাহস?
যদি চাও,
তোমাদের জন্য আমরা দিতে পারি
আর-একটু অন্য রকম এক পৃথিবী
যেখানে বোমার বদলে
শিশুরা আকাশে ওড়ায় কাগজের ঘুড়ি,
যেখানে সীমান্ত মানে
কাঁটাতার নয়, হাত ধরার রেখা|
আমাদের মাটি, তোমাদের মাটি-
একই রোদে পোড়ে, একই বৃষ্টিতে ভেজে,
শুধু মানুষগুলোই
কখনো ভুলে যায় মানুষ হতে|
ঠিক তোমাদের মতো ক্ষমতা আমরা পাব না,
কিন্তু চাইলে
আমরা আমাদের ¯^প্নটা দিতে পারি|
নেবে?
পাথরে খচিত দেহ
বশির আহমেদ
অবসন্ন পলকে ছুঁয়ে যায় বৈশাখী ফুল|
পাথরে খচিত দেহ-
লাবণ্যের রূপরেখা পেরিয়ে বিবর্ণ ফানুস,
অন্তিম শোকগাথা কতদূর?
ক্ষণকাল গোলাপের নষ্ট শরীর,
আশাহত প্রেমের মদিরায়;
খুন হওয়া অপরাহ্ণে, উদ্ভাসিত নীলাভ মেঘের ভেতর-
স্বপ্নীল চোখ|
সাইরেনবিহীন অপঘাতে নিভে যায় আশার প্রদীপ|
নষ্ট সমাজ, মৃত্যুর বদ্বীপে দাঁড়িয়ে;
নিষ্কণ্টক সুরের মূর্ছনায়,
শিউলি ফোটা নগ্ন সন্ধ্যা পেরিয়ে-
ধ্যানমগ্ন বৈশাখী চাঁদ|
দলিল-খতিয়ান
রেজাউল করিম
বহুবছর পর আন্দামানে নির্বাসিত জীবনের অবসানে
যখন ফিরে এলাম নিজভূমে, তখন গ্রীষ্মের মধ্যদুপুর|
পাড়ার এক চাচীমা চিনতে পেরে কী মহব্বতে
আমাকে বুকে আগলে নিলো—
তাকিয়ে দেখি চারদিকে, কী অদ্ভুত পরিবর্তন !
সবই ওলটপালট| যা ছিলো একদিন…
এখন সবই বেহাত- কালের ¯ স্বাক্ষী হয়ে
শুধু এখনো পুরনো পোড়ামাটির ঘরটি কি
এক বিষণ&নতায় স্থির দাঁড়িয়ে|
অতঃপর পিতামহের স্মৃতির সিন্দুকে খুঁজে পেলাম
একদিন সকালে একপ্রস্ত মলিন কাগজপত্র,
গভীর পাঠে বুঝলাম এ তো যেন মস্ত একপ্রস্ত
মূল্যবান প্রামাণ্যপত্র—
আমার পূর্ব পুরুষদের অস্তিত্বের বয়ান
পুরনো দলিল-খতিয়ান|
অতঃপর আরও একবার দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললাম…
মর্মের অনুবাদে
সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার
আকাশের এই সুবিশাল ক্যানভাসে
জলেতে আঁকা তোমার ছবিটা হাসে
তোমার ছবির মর্মের অনুবাদে
বুঝেছি হৃদয় তোমাকে প্রণয় সাধে|
তোমার রচিত ঝর্নার জলছিটা
করেছে শ্যামল তৃষিত বুকের ভিটা
রাঙালে জীবন আলোকের সম্পাতে
ফোটালে ¯^প্ন জীবনের শুভ প্রাতে|
অতলে হারানো অযুত রত্ন মণি
করে সঞ্চয় আমাকে বানালে ধনী
তুমি তো নতুন জীবনের উদ্গাতা
ফেয়ার করেছো অতীতের রাফখাতা|
তোমাকে দিলাম ¯ স্বপ্ন আঁকার তুলি
আঁকিও তুমি, যদি অংকন ভুলি|
এ শহর আমার নয়
রেবেকা ইসলাম
এ শহর আমার নয়,
আরাধ্যের গণ্ডির বাইরে-
অচেনা ˆবরী বাতাস
বয়ে চলে অজানার দিকে|
বুকে জমে আছে
ব্রোঞ্জ যুগের অন্ধকার গুহা,
গুমোট কিছুর অনুভব,
দুর্বোধ্য শব্দের প্রতিধ্বনি-
না সংজ্ঞায়িত, না পরিচিত|
ঘুমঘুম সেই সকালে
বয়েছিল এক ঝড়,
ঘুম ভেঙে যায়,
অলক্ষ্যে হারিয়ে যায়|
ঝুরঝুরে পলেস্তারা
সাজায় সংসারের পাতা,
পোকায় কাটা দুপুর আসে
আলোহীন ক্লান্ত করিডোরে|
বিকেলও আসে
নিজেকে রিফু না করেই|
সত্যি, এ শহর আমার নয়
এ শহর বড় বেশি অচেনা|
মেঘ হয়ে কাঁদো বলে
দীপান্বিতা পালিত
আমায় দু:খ দেবে বলে
চোখে নিলে হাজার মেঘের কালো!
বৃষ্টি এল কান্না থামার আগে
এমনভাবে বাসলে কেন ভালো?
তুমি আমার বেহাগ প্রজাপতি
শর্ত মেনেই আঘাত দিয়ে যাও
এখন আমার কান্না কমই আসে!
পদ্ম-পাতায় ভাসাই চোখের নাও|
তোমার থেকে সরিয়ে নিয়ে চোখ
ভিজতে গেলে হারায় আলপনা
মেঘের মুখ কালো? না হয় হোক|
আমার হৃদয় তোমার দু:খে বোনা!
শূন্যতা প্রতিদিন
য়ানসার হক
আমি শূন্যতাকে চুমু খাই প্রতিদিন
অনন্ত ও অদৃশ্য বলে অভ্যস্ত ভ্রমে
শূন্যতার গভীরে যে আমার ক্লান্ত আঙ্গুল
অনুভব করি জলের উষ্ণ শীতলতা|
আমি তো জানি শূন্যতা আছে অদৃশ্য নিবিড়ে
আলোর ধূসরতা নিয়ে নীরব অপরাহ্নে
অনামা শিশির মায়ার স্থাপত্য নিয়ে|
তবে কী আমি উষ্ণতার আভাস নিয়ে
মায়াবী জলের তন্তুতে এঁকেছি নিঃশব্দ শিহরণ ?
যদি অনিবার্য নিঃসারী হয়ে আলিঙ্গনপিয়াসী হতে
শূন্যতা তোমাকে ফিরিয়ে দিতাম অনন্তমোহে|
ক্ষ&ণণিক নিভে যাওয়া, ক্ষণিক জ্বলা আলোয়|
আমার নীরবতা
সুব্রত আপন
আজ কেন জানি রুঢ় আবেগে জেগেছে জোয়ার
শ্রাবণ মেঘের দিনে সন্ধ্যাতারা মিটিমিটি জ্বলছে
দখিনা বাতাস যেন ছুটে যাচ্ছে ওই পারিজাত বনে
দূর দিগন্তে কে যেন ডাকছে প্রিয় প্রিয় বলে
তবে কী ধরা দিল প্রেম!
যখন মনের বাগানে কৃষ্ণচূড়া ফুটে লাল হলো
বসন্ত ছুঁয়ে জাগালো কামনার ঘোর
একদিন ঠিকই আসলে আমার দুয়ারে—
আমার নীরবতা ভাঙার উন্মত্ত অপ্সরী হয়ে|
আমার মধ্যে বয়ে যাচ্ছে অবিরাম বৃষ্টি
অথচ দ্যাখো তবুও ভীরু মনে হাত ছুঁয়ে বলা হলো না
বড্ড ভালোবাসি তোমায়|
বলতে না পারা সেই ব্যর্থতা আমাকে
এখনো ছুঁতে দেয়নি রোমাঞ্চিত রাত্রি—পার্থিব সুখ
এখনো ঘুমের আবাহনে সারথী হারানোর আর্তনাদে
চিৎকার করে বলে ওঠে—ভালোবাসি-ভালোবাসি|
লিফটের ভেতর
আলী প্রয়াস
লিফটের ভেতর দাঁড়ালেই, মনে হয় পৃথিবীটা আসলে ওপরে ওঠে না—
শুধু মানুষগুলো নিজেদের মুখ বদলায় ধীরে ধীরে|
একটা বাচ্চা মেয়ে স্কুলব্যাগের চেইনে ঝুলিয়ে রেখেছিলো হলুদ বিকেল,
আর এক বৃদ্ধ পকেট থেকে বের করছিলেন পুরোনো হাসপাতালের রসিদ;
আমি তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের আয়ু অনুভব করছিলাম|
তুমি তখন হয়তো শহরের অন্য প্রান্তে কোনো এটিএম বুথের সামনে,
শেষ পাঁচশো টাকার নোটটা হাতে নিয়ে ভাবছিলে—
ভালোবাসাও কি একধরনের লেনদেন?
হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলো|
অন্ধকারে কেউ একজন হাসলো, কেউ ফোনের টর্চ জ্বালালো
আর আমি দেখলাম—মানুষের ভয় আসলে খুব ছোট্ট জিনিস,
কিন্তু তার একাকীত্ব বিশাল ফ্লাইওভারের নিচে ঘুমিয়ে থাকা একটা শহরের সমান|
লিফট আবার নামতে শুরু করলে আমার মনে হলো,
আমরা কেউই কোথাও পৌঁছাই না—
শুধু প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেদের ভিতর হারিয়ে যাই|






















































