নিজস্ব প্রতিবেদক »
অবশেষে থেমে গেল এস আলম গ্রুপের শিল্পচাকা। কাঁচামালের তীব্র সংকট, এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলতে দীর্ঘদিনের জটিলতা এবং আর্থিক সংকটের কারণে গ্রুপটির সব ১১টি উৎপাদনমুখী কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিক। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) এ সিদ্ধান্তের কথা জানায় গ্রুপ কর্তৃপক্ষ। আগামী ১ আগস্ট থেকে তা কার্যকর হবে।
একসময় দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত এস আলম গ্রুপের এই সিদ্ধান্তে শুধু হাজারো শ্রমিকের জীবিকাই অনিশ্চয়তায় পড়েনি, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী শিল্পাঞ্চলের বড় একটি শিল্প কার্যক্রমও কার্যত থেমে গেল। চিনি, সিমেন্ট, ভোজ্যতেল, স্টিল ও অন্যান্য শিল্পপণ্য উৎপাদনকারী এসব কারখানা দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত পরিসরে চলছিল। শেষ পর্যন্ত কাঁচামালের সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব না হওয়ায় সব কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
এস আলম গ্রুপের সিনিয়র ম্যানেজার (এইচআরডি) মোহাম্মদ হোসেন রানা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংকগুলো এলসি সুবিধা বন্ধ করে দিলে কাঁচামাল আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকেই একের পর এক কারখানার উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়ে। সে সময় কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাই করা হলেও গত প্রায় দুই বছর ধরে অবশিষ্ট প্রায় আড়াই হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করেছে গ্রুপটি।
তিনি বলেন, গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের আশা ছিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কারখানাগুলো আবার চালু করা যাবে। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও সেই পরিস্থিতি তৈরি না হওয়ায় বিপুলসংখ্যক কর্মীর বেতন বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, বৃহস্পতিবার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, বোনাস, গ্র্যাচুইটি ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা গেলে আগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কারখানাসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন ধরে এলসি খোলা যাচ্ছিল না। ফলে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। মজুত কাঁচামাল দিয়ে কয়েক মাস উৎপাদন চালানো হলেও নতুন করে কাঁচামাল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এতে একে একে সব উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যায়। এখন কারখানাগুলো পুরোপুরি উৎপাদনশূন্য।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগের আশ্বাস দেওয়া হলেও কবে নাগাদ কারখানা চালু হবে, সে বিষয়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ কোনো সময়সীমা জানাতে পারেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে রয়েছে এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস, ইনফিনিটি সিআর স্ট্রিপস ইন্ডাস্ট্রিজ, এস আলম স্টিল, চেমন স্টিল, গ্যালকো স্টিল, এস আলম ব্যাগ লিমিটেড, এস আলম সিমেন্ট, এস আলম ভেজিটেবল অয়েলসহ কর্ণফুলী শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত গ্রুপটির সব উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
কারখানা বন্ধের ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমিকরা। তাদের অভিযোগ, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে তারা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে এসব কারখানার আয়ের ওপর নির্ভরশীল হাজারো পরিবারের সামনে এখন জীবিকা সংকট দেখা দিয়েছে। চাকরি হারানো শ্রমিক নজরুল বলেন, ‘হঠাৎ করেই চাকরি চলে গেছে। মাস শেষে পরিবারের খরচ, সন্তানদের লেখাপড়া আর বাসাভাড়া কীভাবে চালাব, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। নতুন চাকরিও সহজে মিলছে না।’
শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠকে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আগামী এক মাসের মধ্যে বকেয়া বেতন, ওভারটাইম ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের আশ্বাস দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের শ্রমিকরা জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে কারখানার প্রজেক্ট ডিরেক্টর ও প্রধান মানবসম্পদ ও প্রশাসন (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সাইফুল আলম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ছাঁটাই হওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ১ আগস্ট থেকে তাদের চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। তবে এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কারখানা একেবারে বন্ধ বলা যাবে না। কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কাঁচামাল আমদানি সম্ভব হচ্ছিল না। মজুত কাঁচামাল দিয়েই এতদিন উৎপাদন চলেছে। অন্য কারখানাগুলোর অবস্থাও একই।’
এর আগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা ও ব্যাংকিং সংকটের কারণ দেখিয়ে গ্রুপটির কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এবার সংকট আরও গভীর হওয়ায় কর্ণফুলী শিল্পাঞ্চলে এস আলম গ্রুপের সব উৎপাদন কার্যক্রমই কার্যত থেমে গেল।
উৎপাদিত হতো চিনি, সিমেন্ট,ভোজ্যতেল ও স্টিল
কারখানাগুলোর উৎপাদন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের দুটি ইউনিটে বছরে প্রায় সাড়ে সাত লাখ মেট্রিক টন পরিশোধিত চিনি উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল। এস আলম সিমেন্টে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ২০০ মেট্রিক টন সিমেন্ট উৎপাদিত হতো। এস আলম ভেজিটেবল অয়েলে প্রতিদিন ১৭০ মেট্রিক টন ভোজ্যতেল পরিশোধন এবং ৩০ মেট্রিক টন বোতলজাত করার সক্ষমতা ছিল। পাশাপাশি এস আলম সুপার এডিবল অয়েলে দৈনিক ৭০০ মেট্রিক টন পরিশোধিত ও ৫০০ মেট্রিক টন সুপার রিফাইন্ড ভোজ্যতেল উৎপাদন করা হতো।
অন্যদিকে এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলসে বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন কোল্ড রোল্ড স্টিল উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল। এছাড়া এস আলম স্টিল, চেমন স্টিল, গ্যালকো স্টিল ও ইনফিনিটি সিআর স্ট্রিপসে জিআই শিট, ঢেউটিন, কোল্ড রোল্ড কয়েলসহ বিভিন্ন ধরনের ইস্পাতপণ্য উৎপাদিত হতো, যা দেশের নির্মাণ ও শিল্প খাতের গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা পূরণ করত।
ঋণ ও মামলার চাপে শিল্পগোষ্ঠী
২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর এস আলম গ্রুপ নানা আর্থিক ও আইনি চাপে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গ্রুপটি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক থেকেই নেওয়া হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। পাওনাদার ব্যাংকগুলোর দাবি, ঋণ খেলাপি, চেক প্রত্যাখ্যান, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তসহ বিভিন্ন অভিযোগে গ্রুপটির বিরুদ্ধে ৫০০-এর বেশি মামলা চলমান রয়েছে। এসব মামলার কয়েকটিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও আদালতের বিভিন্ন আদেশ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এস আলম গ্রুপের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।













































