ফিচার এলাটিং বেলাটিং

অয়ন্তিসোনা আর দুষ্টু কাঠবিড়ালি

পঙ্কজ শীল »

ঢাকার গুলশানের একটি সুন্দর বাসায় থাকে ফুটফুটে একটি মেয়ে। তার নাম অয়ন্তি। কিন্তু সবাই তাকে আদর করে ডাকত অয়ন্তিসোনা। অয়ন্তিসোনার বড় বড় কৌতূহলী চোখ, মিষ্টি হাসি আর সারাক্ষণ কিছু না কিছু জানার আগ্রহ ছিল। তার বাবা অপুর খুব শখ ছিল মেয়েকে গল্প শোনানোর, আর মা পাপ্পি প্রতিদিন নতুন নতুন ছড়া শেখাতেন। অয়ন্তিসোনা গাছপালা, পাখি আর ছোট ছোট প্রাণী খুব ভালোবাসত। তাদের বাসার বারান্দায় কয়েকটি টব ছিল। সেখানে নানা রঙের ফুল ফুটত। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই অয়ন্তিসোনা বারান্দায় গিয়ে ফুলগুলোর সঙ্গে কথা বলত। সে ভাবত, ফুলরাও বুঝি মানুষের মতো হাসে, কাঁদে আর গল্প করে।
একদিন সকালে বারান্দায় গিয়ে অয়ন্তিসোনা অবাক হয়ে গেল। একটি ছোট্ট কাঠবিড়ালি টবের পাশে বসে লেজ নাচাচ্ছে। তার চোখ দুটি চকচক করছে আর মুখে যেন দুষ্টুমির হাসি। অয়ন্তিসোনা ধীরে ধীরে কাছে যেতেই কাঠবিড়ালিটি টুপ করে এক টব থেকে আরেক টবে লাফ দিল। তারপর আবার ছুটে গিয়ে রেলিংয়ের ওপরে বসে পড়ল। অয়ন্তিসোনা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। সে মাকে ডাকল, ‘মা, মা! দেখো, আমাদের বাসায় একটা কাঠবিড়ালি এসেছে!’ পাপ্পি এসে দেখে হাসলেন। তিনি বললেন, ‘খুব সুন্দর তো! তবে সাবধানে থেকো, মনে হয় খুব দুষ্টু।’
অয়ন্তিসোনা তখনও জানত না, এই কাঠবিড়ালিটিই তার জীবনের সবচেয়ে মজার বন্ধুত্বের গল্প হয়ে উঠবে।
পরের দিন সকালে অয়ন্তিসোনা আবার বারান্দায় গিয়ে দেখে একটি টব কাত হয়ে পড়ে আছে। মাটিও ছড়িয়ে গেছে। সে অবাক হয়ে চারদিকে তাকাল। তখনই রেলিংয়ের ওপর থেকে সেই কাঠবিড়ালি মুখ বের করে তাকাল। তার মুখে যেন চওড়া হাসি। অয়ন্তিসোনা বুঝে গেল, এ কাজ নিশ্চয়ই তারই। সে বলল, ‘এই যে দুষ্টু, তুমি কি টব ফেলে দিয়েছ?’ কাঠবিড়ালিটি যেন উত্তর দেওয়ার বদলে লেজ ঝাঁকিয়ে ছুটে পালাল। সেদিন থেকেই অয়ন্তিসোনা তার নাম দিল ‘দুষ্টু কাঠবিড়ালি’।
দিন যেতে লাগল। দুষ্টু কাঠবিড়ালি প্রায় প্রতিদিনই আসত। কখনো ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে ফেলত, কখনো শুকনো পাতা নিয়ে দৌড়াত, কখনো আবার অয়ন্তিসোনার রেখে দেওয়া বিস্কুটের টুকরোগুলো নিয়ে যেত। অয়ন্তিসোনা প্রথমে একটু রাগ করলেও পরে মজা পেতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, কাঠবিড়ালিটি আসলে খারাপ নয়, শুধু খুব চঞ্চল আর খেলাপ্রিয়। তাই সে প্রতিদিন কিছু বাদাম আর বিস্কুটের টুকরো রেখে দিত। কাঠবিড়ালিটিও ধীরে ধীরে তাকে ভয় পাওয়া বন্ধ করে দিল। এখন সে অয়ন্তিসোনার সামনে বসেই খাবার খেত।
একদিন বিকেলে বাবা অপু অফিস থেকে ফিরে দেখলেন, অয়ন্তিসোনা বারান্দায় বসে কারও সঙ্গে কথা বলছে। কাছে গিয়ে দেখলেন, সে কাঠবিড়ালির সঙ্গে গল্প করছে। অপু হেসে বললেন, ‘সে কি তোমার কথা বুঝতে পারে?’ অয়ন্তিসোনা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, ‘অবশ্যই পারে। ও শুধু কথা বলতে পারে না।’ অপু মুগ্ধ হয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। শিশুদের কল্পনার জগৎ যে কত সুন্দর, তা তিনি ভালো করেই জানতেন।
কয়েকদিন পর স্কুলে ছুটি পড়ল। ঠিক হলো অয়ন্তিসোনা যাবে তার মামার বাড়ি সাচনায়। সে খুব খুশি হলো। কারণ সাচনার গল্প সে অনেক শুনেছে। সেখানে আছে সবুজ মাঠ, পাখির ডাক, নদীর হাওয়া আর তার প্রিয় মামা কবি পঙ্কজ শীল। অয়ন্তিসোনা যাওয়ার আগের দিন দুষ্টু কাঠবিড়ালিকে বলল, ‘আমি কয়েকদিনের জন্য যাচ্ছি। তুমি কিন্তু আমাকে ভুলে যেও না।
কাঠবিড়ালিটি যেন কথাটা বুঝল। সে চুপচাপ বসে অয়ন্তিসোনার দিকে তাকিয়ে রইল।
পরদিন সকালে তারা সাচনার উদ্দেশে রওনা দিল। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন মামার বাড়ি পৌঁছাল, তখন বিকেলের নরম রোদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। মামা পঙ্কজ শীল দরজায় দাঁড়িয়ে হাসিমুখে তাদের স্বাগত জানালেন। তিনি শুধু কবিই ছিলেন না, শিশুদের খুব ভালোবাসতেন। অয়ন্তিসোনাকে দেখেই বললেন, ‘আমার ছোট্ট রাজকন্যা এসেছে!’ অয়ন্তিসোনা দৌড়ে গিয়ে মামাকে জড়িয়ে ধরল।
সাচনার পরিবেশ ছিল একেবারে অন্যরকম। এখানে উঁচু দালান নেই, গাড়ির শব্দ নেই। আছে শুধু পাখির ডাক, বাতাসের সুর আর সবুজের সমুদ্র। অয়ন্তিসোনা সকালবেলা উঠেই মাঠে হাঁটতে যেত। একদিন সে মামার সঙ্গে নদীর পাড়ে গেল। সেখানে অনেক কাঠবিড়ালি গাছে গাছে ছুটোছুটি করছিল। তাদের দেখে অয়ন্তিসোনার ঢাকার দুষ্টু বন্ধুটির কথা মনে পড়ল। সে একটু মন খারাপ করে বলল, ‘মামা, আমার কাঠবিড়ালি বন্ধুটাকে খুব মনে পড়ছে।’ পঙ্কজ শীল মৃদু হেসে বললেন, ‘সত্যিকারের বন্ধুত্ব কখনো দূরে যায় না।’
সেই রাতে মামা অয়ন্তিসোনাকে একটি গল্প শোনালেন। গল্পে ছিল এক কাঠবিড়ালি, যে বনজঙ্গলের সব প্রাণীকে সাহায্য করত। গল্প শুনতে শুনতে অয়ন্তিসোনার মনে হলো, তার দুষ্টু কাঠবিড়ালিটিও হয়তো তেমনই ভালো। শুধু সে তার ভালো দিকগুলো এখনো পুরোপুরি দেখেনি।
কয়েকদিন আনন্দে কাটল। অয়ন্তিসোনা মাঠে খেলল, গাছে আম পাড়ল, নদীর পাড়ে হাঁটল, পাখি দেখল। কিন্তু ঢাকায় ফেরার সময় যত কাছে এল, তার মনে ততই দুষ্টু কাঠবিড়ালির কথা ঘুরতে লাগল। অবশেষে একদিন তারা আবার গুলশানের বাসায় ফিরে এল।
বাসায় ফিরে অয়ন্তিসোনা প্রথমেই বারান্দায় ছুটল। কিন্তু সেখানে কাঠবিড়ালিটিকে দেখা গেল না। একদিন গেল, দুইদিন গেল, তিনদিন গেল। তবুও সে এল না। অয়ন্তিসোনা খুব মন খারাপ করে বসে থাকল। সে ভাবল, হয়তো কাঠবিড়ালিটি তাকে ভুলে গেছে।
চতুর্থ দিনের সকালে হঠাৎ টবের পাশে খসখস শব্দ হলো। অয়ন্তিসোনা দৌড়ে গিয়ে দেখল, তার দুষ্টু কাঠবিড়ালি ফিরে এসেছে। কিন্তু আজ সে আগের মতো চঞ্চল নয়। তার এক পায়ে সামান্য আঘাত লেগেছে। অয়ন্তিসোনা উদ্বিগ্ন হয়ে গেল। সে বাবাকে ডাকল। অপু সাবধানে দেখে বললেন, ‘ভয় নেই, ছোটখাটো আঘাত।’
অয়ন্তিসোনা প্রতিদিন তার জন্য খাবার রাখত। দূর থেকে খেয়াল রাখত, যেন সে নিরাপদে থাকে। কয়েকদিনের মধ্যেই কাঠবিড়ালিটি সুস্থ হয়ে উঠল। তারপর আবার আগের মতো লাফালাফি শুরু করল। তবে এবার তার মধ্যে যেন একটু পরিবর্তন এসেছে। সে আর টব ফেলে দেয় না। ফুল নষ্ট করে না। বরং চুপচাপ এসে খাবার খায় আর কিছুক্ষণ বসে থাকে।
একদিন বিকেলে প্রবল ঝড় উঠল। আকাশ কালো হয়ে গেল। বাতাসে গাছের ডালপালা দুলতে লাগল। হঠাৎ অয়ন্তিসোনা দেখতে পেল, একটি ছোট পাখির ছানা বাসা থেকে পড়ে গেছে। ঝড়ের কারণে কেউ তার কাছে যেতে পারছে না। ঠিক তখনই দুষ্টু কাঠবিড়ালিটি ছুটে এল। সে বারবার ছানাটির কাছে গিয়ে দাঁড়াতে লাগল, যেন সাহায্য চাইছে। অয়ন্তিসোনা বিষয়টি বুঝে বাবাকে ডাকল। অপু সাবধানে ছানাটিকে তুলে নিরাপদ জায়গায় রাখলেন।
সেদিন অয়ন্তিসোনা বুঝতে পারল, দুষ্টু কাঠবিড়ালির মন আসলে খুব ভালো। বাইরে থেকে সে যতই চঞ্চল আর দুষ্টু হোক, তার ভেতরে আছে মমতায় ভরা একটি হৃদয়। সে কাঠবিড়ালিটির মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল, ‘তুমি শুধু দুষ্টু নও, তুমি খুব ভালোও।’
সন্ধ্যায় মা পাপ্পি বারান্দায় এসে দেখলেন, অয়ন্তিসোনা আর কাঠবিড়ালি পাশাপাশি বসে আছে। ডুবন্ত সূর্যের আলো তাদের ওপর পড়ে সোনালি আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। পাপ্পি মুচকি হেসে বললেন, ‘দেখছি তোমাদের বন্ধুত্ব এখন বেশ গভীর হয়েছে।’ অয়ন্তিসোনা হাসল। তার মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বন্ধুত্বগুলো হয়তো এমনই হয়। যেখানে ভাষা লাগে না, প্রয়োজন হয় না কোনো প্রতিশ্রুতির। শুধু একটু ভালোবাসা আর বিশ্বাসই যথেষ্ট।
সেদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে অয়ন্তিসোনা জানালার বাইরে তাকাল। রেলিংয়ের ওপর বসে দুষ্টু কাঠবিড়ালিটি লেজ নেড়ে যেন বিদায় জানাচ্ছে। আকাশে তখন অসংখ্য তারা জ্বলছে। অয়ন্তিসোনার মনে হলো, বন্ধুত্ব ঠিক তারার মতো। কখনো কাছে থাকে, কখনো দূরে। কিন্তু তার আলো সবসময় হৃদয়ের আকাশে জ্বলজ্বল করে। আর সেই আলোয় ভর করেই ছোট্ট অয়ন্তিসোনা, তার বাবা অপু, মা পাপ্পি, মামা কবি পঙ্কজ শীল এবং দুষ্টু কাঠবিড়ালির গল্প এক মায়াময় স্মৃতিতে পরিণত হলো, যা সে সারাজীবন মনে রাখবে।