চকরিয়ায় বিস্তীর্ণ জমি তামাকের পেটে

0
80

চরম হুমকিতে নিরাপদ কৃষি খাদ্য উৎপাদন

কমছে ফসলি জমি

 

নিজস্ব প্রতিনিধি, চকরিয়া :

প্রতিবছরের মতো এবারও কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার অন্তত সাতটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জমিতে পরিবেশ বিধ্বংসী তামাকের ভয়াবহ আগ্রাসন ঘটেছে। ফসলি জমির পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমির খাসজমি ও মাতামুহুরী নতীর দুই তীরে তামাক চাষ হয়েছে। কয়েকবছর ধরে তামাক চাষের বিরুদ্ধে উপজেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ের চাষীদের নিরুৎসাহিত করতে সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও কিন্তু তা কোন কাজে আসেনি। অভিযোগ উঠেছে, অসংখ্য তামাক কোম্পানি চাষিদের তামাক পোড়ানোর সরঞ্জাম সরবরাহ এবং দাদন হিসেবে অগ্রিম টাকা দেয়ার প্রলোভনে ফেলে পরিবেশ বিধ্বংসী তামাক চাষে নামিয়েছে। কৃষি জমিতে তামাক আবাদের ফলে চলতি মৌসুমে বোরোর আবাদ ও রবিশস্য উৎপাদনে ব্যাপক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তামাক চাষের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন জোরদারে নিয়োজিত এনজিও সংস্থা উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা (উবিনীগ) কক্সবাজারের আঞ্চলিক সমন্বয়ক জয়নাল আবেদিন খান বলেন, প্রতিবছর চকরিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ জমিতে পরিবেশ বিধ্বংসী তামাক চাষ বেড়ে চলছে। ফসলি জমিতে তামাক চাষের কারণে আবাদি জমির পরিমাণ কমতে থাকায় এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে কৃষি উৎপাদন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্য উদ্বৃত্ত প্রতিটি জনপদে একসময় চরম খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কা দেখা দেবে। এ জন্য তামাক চাষ বন্ধে প্রশাসনকে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সরেজমিন দেখা গেছে, সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে চকরিয়া উপজেলার বমুবিলছড়ি, সুরাজপুর-মানিকপুর, এবং কাকারা,  কৈয়ারবিল, বরইতলী, লক্ষ্যারচর, ফাঁসিয়াখালী ও কৈয়ারবিল ইউনিয়নে ফসলি জমির পাশাপাশি বমু বিলছড়ি, সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা ইউনিয়নে বনবিভাগের বিপুল জমি ও মাতামুহুরী নদী তীরে জেগেউঠা চরের জমিতে তামাক চাষ হয়েছে।

দুইমাস আগে রোপিত বেশিরভাগ তামাক ক্ষেত এখন কাটা শুরু হয়েছে। এখন চলছে তামাক পোড়ানোর কাজ। এ লক্ষ্যে তামাক চাষ অধ্যুষিত বনাঞ্চলের আশপাশে ও লোকালয়ে আগেভাগে শতশত তামাক চুলীর নির্মাণকাজও শুরু হয়েছে। ওইসব এলাকার গ্রামের ভেতরে বাড়ির আঙ্গিনায় স্থাপন করা হচ্ছে তামাক পোড়ানোর শত শত চুলি। তামাক পোড়ানো কাজ শুরু হওয়ায় চুলির বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে গ্রামের বাড়িতে ঢুকছে। এতে গ্রামের মানুষ চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে।

‘বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েছে। তামাকের কটু গন্ধে ঘরে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। তামাক পাতা কাটা ও পোড়ানোর কাজে চাষিরা নারী ও শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। যা অমানবিক। নারী-শিশুদের কম মজুরি দিতে হয় তাই তাদের খাটায় চাষিরা। এতে শিশুরা প্রাথমিক পর্যায় শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়ছে।’ পাশাপাশি বসতবাড়িতে অগ্নিকান্ডের প্রবণতাও বাড়ছে।

সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে কাঠ পাচারকারীচক্র তামাক পোড়ানোর জন্য বনবিভাগের বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে নির্বিচারে বনজ সম্পদ উজাড় করে চলছে। এ অবস্থার কারণে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাহাড় এখন ন্যাড়া পাহাড়ে পরিণত হচ্ছে।

চকরিয়া পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি এমআর মাহমুদ বলেন, নাগরিক সচেতনায় প্রশাসনিক এত আয়োজনের পরও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ফসলি জমির পাশাপাশি সংরিক্ষত বনাঞ্চল এবং মাতামুহুরী নদীর তীরে তামাকের আগ্রাসন চলছে।

সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিমুল হক আজিম বলেন, ‘তামাক চাষ কোনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। চাষিরা বেশিভাগ গরীব। তাঁরা দাদনদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে কৃষকরা, এতে তারা তামাক চাষ করে লাভবানও হচ্ছে না।’

চকরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস.এম. নাসিম হোসেন বলেন, ‘তামাক চাষের কুফল সম্পর্কে ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় মাঠ বৈঠকের কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এতে এই বছর অন্য বছরের তুলনায় ১০৫ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়নি। তারা এসব জমিতে সবজি, সরিষা ও ফুল চাষ করেছে।’

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘তামাক কৃষি পণ্য। যেকোন চুলি স্থাপনে পরিবেশের ছাড়পত্র নিতে হয়, তামাক চুলি স্থাপনে কাউকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। বায়ুদূষণ যেন না হয় সেই জন্য কৃষকদের সচেতন হতে হবে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।