টপ নিউজ

সিইউএফএলের বিদ্যুৎ বিক্রি হচ্ছে বাইরে !

 আনোয়ারায় অবস্থিত সিইউএফএল সার কারখানা।

জাহিদ হাসান হৃদয় »

চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়ায় অবস্থিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সার কারখানা চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) পরিচালনায় নিজস্ব প্লান্টে উৎপাদিত বিদ্যুৎ স্থানীয় বাজার এবং বাসাবাড়িতে অবৈধভাবে সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে।

---------

১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর কারখানাটিতে দৈনিক ইউরিয়া উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন এবং বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৫ লাখ ৬১ হাজার মেট্রিক টন। পাশাপাশি অ্যামোনিয়া উৎপাদনের ক্ষমতা ছিল দৈনিক ১ হাজার মেট্রিক টন।

তবে সময়ের ব্যবধানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কারখানাটিতে প্রায় সারা বছরই উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানাটি থেমে নেই লুটপাট ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময় কারখানাটি নিয়ে এরকম নানা ধরনের অভিযোগ ওঠে। এবার সেই অভিযোগে যোগ হয়েছে, কারখানাটির পরিচালনার জন্য স্থাপিত বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে কারখানার বাইরে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)-এর কোনো অনুমোদন রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

জানা যায়, সিইউএফএলের কারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের জন্য রয়েছে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট। কারখানার উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখতে স্থাপন করা হয়েছে স্টিম টারবাইন জেনারেটর (এসটিজি) ব্যবস্থা। এতে রয়েছে দুটি ইউনিট, যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ প্রায় ২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি মূলত কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত উচ্চচাপের বাষ্প কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। একই সঙ্গে উৎপাদিত বাষ্প ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া উৎপাদনের বিভিন্ন প্রক্রিয়াতেও ব্যবহার করা হয়।

সিইউএফএলের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা থাকায় জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমে এবং কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। প্রয়োজন অনুযায়ী জাতীয় গ্রিড থেকেও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

এ বিষয়ে সিইউএফএলের উৎপাদন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) উত্তম চৌধুরী বলেন, “সিইউএফএলের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য দুটি ইউনিট রয়েছে। এগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ১২ মেগাওয়াট করে। বর্তমানে ৮ থেকে ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড-১ ও ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড-২-এও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।”

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে সিইউএল সার কারখানার নিজস্ব উৎপাদিত বিদ্যুৎ কারখানার বাইরে বাজারের দোকানপাট ও আবাসিক ভবনে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুমোদন, সংযোগের বৈধতা এবং বিল আদায়ের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, রাঙ্গাদিয়া বাজারের শতাধিক দোকান ও বাসাবাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে সিইউএফএলের বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব সংযোগ থেকে প্রতি মাসে দুই লাখ টাকার বেশি বিদ্যুৎ বিল আদায় হয় বলে জানা গেছে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিল বকেয়া রেখেও বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সিইউএফএল থেকে তিনটি মিটারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয়েছে। পরে ওই সংযোগ ব্যবহার করে রাঙ্গাদিয়া বাজারের বিভিন্ন দোকান ও বসতঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে সিইউএফএলের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কাজী আমিনুল হক বলেন, “শুরু থেকেই এসব জায়গায় সিইউএফএল থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ টাকার মতো বিল আসে, তারা এসব পরিশোধ করে দেয়। তবে করোনাকালীন সময়ে কিছু বিল বকেয়া হয়েছিল।”

জানা যায়, ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়ের নীতিমালা-২০০৭ অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ব্যবহারের জন্য স্থাপিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বাইরে সরবরাহ বা বিক্রি করতে চাইলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-এর লাইসেন্স ও অনুমোদন নিতে হয়।

বিদ্যুৎ বিক্রি করতে হলে বিইআরসি অনুমোদিত ট্যারিফ, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমতি প্রয়োজন। পাশাপাশি গ্রিড সংযোগ, মিটারিং, সুরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য কারিগরি শর্ত পূরণ করতে হয়।

অথচ এসব নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই দীর্ঘদিন ধরে সিইউএফএলের কারখানার জন্য উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংলগ্ন বাজার ও আবাসিক স্থাপনায় সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমান বলেন, “আমি আসার অনেক আগে থেকেই এই ব্যবস্থা চলে আসছে। কী নিয়মে, কীভাবে এটি শুরু হয়েছে, তা আমি জানি না। বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”