এ মুহূর্তের সংবাদ

শর্ট-ভিডিওর নেশা, প্রজন্মের মেধা সস্তা বিনোদনের বলি হচ্ছে

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘স্ক্রলিং’ সংস্কৃতি| বিশেষ করে টিকটক, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম রিলসের মতো ¯^ল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওর মোহ এখন আসক্তির পর্যায়ে পৌঁছেছে| আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) এবং অক্সফোর্ড ডিকশনারির ‘ব্রেইন রট’ বা ‘মস্তিষ্কের পচন’ সংক্রান্ত তথ্যগুলো আমাদের এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে| প্রশ্ন উঠেছে, আমরা কি মুহূর্তের উত্তেজনার লোভে আমাদের দীর্ঘমেয়াদী বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলছি?

৭১টি গবেষণার প্রায় ৯৮ হাজার মানুষের ওপর চালানো বিশ্লেষণ থেকে যে তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা রীতিমতো পিলে চমকানো| ¯^ল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওর প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা মানুষের মনোযোগের গভীরতা বা ‘অ্যাটেনশন স্প্যান’ কমিয়ে দিচ্ছে| গবেষকদের মতে, এই দ্রুতগতির কনটেন্টগুলো মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণের একটি ‘রিইনফোর্সমেন্ট লুপ’ বা চক্র ˆতরি করে| ফলে মানুষ যখন কোনো ধীরস্থির কাজ যেমন—বই পড়া, সমস্যা সমাধান বা গভীর কোনো তাত্ত্বিক বিষয় শিখতে যায়, তখন মস্তিষ্ক আর সেই আগের মতো সংবেদনশীল থাকে না| জীবন যখন কেবল ১৫ সেকেন্ডের ঝটকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন দীর্ঘমেয়াদী পরিশ্রমের কাজগুলো পাহাড়সম বোঝা মনে হয়|
এপিএর প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রিলস বা শর্ট-ভিডিওর এই আসক্তি কেবল সময় নষ্ট করছে না, বরং এটি আমাদের স্মৃতিশক্তি, ভাষা ব্যবহারের দক্ষতা এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে| অক্সফোর্ড ডিকশনারি ২০২৪ সালে ‘ব্রেইন রট’ শব্দটিকে ‘ওয়ার্ড অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করে আসলে আমাদের ডিজিটাল অবক্ষয়কেই ¯^ীকৃতি দিয়েছে| এই অবক্ষয়ের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং একাকিত্বকেও উসকে দিচ্ছে| বাস্তব জগতের রক্ত-মাংসের মানুষের সাথে যোগাযোগের চেয়ে ডিজিটাল ইন্টারঅ্যাকশন যখন মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন মানুষের মানসিক তৃপ্তি কমতে শুরু করে|
স্মর্তব্য যে, কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা চ্যাটজিপিটির মতো প্রযুক্তির অপব্যবহারও আমাদের চিন্তাশক্তিকে অলস করে দিচ্ছে| এমআইটির গবেষণায় দেখা গেছে, প্রযুক্তির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতায় মানুষের সৃজনশীলতা ও স্মরণশক্তি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাচ্ছে| ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় শিশুদের স্মৃতি ও শব্দভাণ্ডার কমে যাওয়ার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা জাতির আগামী দিনের মেধা কাঠামোর জন্য এক অশনিসংকেত|
এখনই সময় এই ‘ডিজিটাল ড্রাগ’ থেকে নিজেদের এবং পরবর্তী প্রজন্মকে রক্ষা করার| প্রযুক্তির অগ্রগতিকে অ¯^ীকার করার উপায় নেই, তবে তার দাসত্ব করা আত্মঘাতী| আমাদের ফিরে যেতে হবে ধীরস্থির অভ্যাসে—বই পড়া, বাগান করা, কিংবা প্রিয়জনের সাথে সশরীরে আড্ডা দেওয়ার সংস্কৃতিতে| ডিজিটাল ডিটক্স বা স্ক্রিন টাইমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার অপরিহার্য শর্ত| মনে রাখতে হবে, মস্তিষ্ক কোনো সস্তা বিনোদনের ডাস্টবিন নয়; একে সজীব ও ধারালো রাখতে হলে গভীর চিন্তা ও মননশীলতার চর্চা অপরিহার্য| নতুবা ‘ব্রেইন রট’-এর এই মহামারীতে আমাদের মেধা ও প্রজ্ঞা ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাবে|