ওমর ফারুক »
শেয়ারবাজারে আলোচিত-সমালোচিত তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান ফ্যামিলিটেক্স (বিডি) লিমিটেডের কর্ণধার মোহাম্মদ মেরাজ-ই-মোস্তফা কায়সার সপরিবারে কানাডায় চলে গেছেন—এমন দাবি করেছে ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্র।
একই পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান এনএলজেড ফ্যাশন লিমিটেডও বর্তমানে বন্ধ। এ দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে ওয়ান ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পাওনা প্রায় ১৭২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
এর মধ্যে এনএলজেড ফ্যাশনের কাছে ওয়ান ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার পাওনা ১২৩ কোটি ৫৯ লাখ ৭৪ হাজার ৪১৯ টাকা। এই অর্থ আদায়ে করা মামলায় গত ১৭ আগস্ট চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত-৩ বিবাদীদের খরচসহ পাওনা পরিশোধে ৬০ দিনের সময় দিয়েছেন। তবে বিপুল এই পাওনার বিপরীতে ব্যাংকের হাতে থাকা জামানতের মূল্য মাত্র প্রায় দুই কোটি টাকা।
অন্যদিকে ফ্যামিলিটেক্সের কাছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় ৪৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এ ঋণ আদায়ে বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগের পাশাপাশি চট্টগ্রাম ইপিজেডে থাকা প্রতিষ্ঠানটির কারখানা, ভবন, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা)।
ফলে একদিকে আদালতের রায়, অন্যদিকে কারখানা নিলামে বিক্রির উদ্যোগ—সব মিলিয়ে একই পরিবারের দুই প্রতিষ্ঠানের বিপুল ঋণ আদায় এখন ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৬০ দিনে ১২৩ কোটি পরিশোধের নির্দেশ
গত ১৭ আগস্ট চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত-৩-এর বিচারক সেজুতি জান্নাত ওয়ান ব্যাংকের করা মামলায় রায় দেন। রায়ে এনএলজেড ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মেরাজ-ই-মোস্তফা কায়সার, তাঁর মা ও প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হোসনে আরা বেগম, স্ত্রী ও পরিচালক তাবাস্সুম করিম এবং চাচা মোহাম্মদ মনজুরুল আলমকে ব্যাংকের পাওনা ১২৩ কোটি ৫৯ লাখ ৭৪ হাজার ৪১৯ টাকা খরচসহ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায়ের পর ব্যাংকের সামনে এখন মূল প্রশ্ন, নির্ধারিত ৬০ দিনের মধ্যে এই বিপুল অর্থ কীভাবে আদায় করা সম্ভব হবে। কারণ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের হাতে থাকা সম্পদের মূল্য পাওনার তুলনায় অত্যন্ত কম।
ওয়ান ব্যাংকের মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী আকবর আজিজ বলেন, ব্যাংকের পাওনা আদায়ের জন্য আইন অনুযায়ী অর্থঋণ আদালতে মামলা করা হয়েছে। আদালত রায়ে বিবাদীদের পাওনা পরিশোধের জন্য ৬০ দিনের সময় দিয়েছেন। রায়ের পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাংকের পাওনা আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
১২৩ কোটি টাকার বিপরীতে জামানত ২ কোটি
এনএলজেড ফ্যাশনের ঋণের বিপরীতে ওয়ান ব্যাংকের কাছে কক্সবাজারের ইনানীতে ৫০ দশমিক ৫০ শতক জমি জামানত হিসেবে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে ওই জমির সর্বোচ্চ বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা।
অর্থাৎ ১২৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকার পাওনার বিপরীতে জামানতের মূল্য মাত্র প্রায় দুই কোটি টাকা। ওই সম্পত্তি বিক্রি করলেও পাওনার বড় অংশ অনাদায়ী থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এর সঙ্গে ঋণগ্রহীতা ও পরিচালকদের বিদেশে অবস্থানের বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
৭ এপ্রিল মামলা, চার মাসেই রায়
এনএলজেড ফ্যাশনের ঋণ আদায়ে ৭ এপ্রিল ২০২৬ চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালত-৩-এ মামলা করে ওয়ান ব্যাংক। মামলাটির নম্বর ৮৯/২০২৬।
মামলার নথি অনুযায়ী, রায় ঘোষণার সময় বাদী ব্যাংকের পক্ষ থেকে আদালতে কেউ উপস্থিত ছিলেন না। তবে আদালত বিবাদীদের ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন।
ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে কাঁচামাল আমদানি ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য ওয়ান ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা থেকে ঋণ নেয় এনএলজেড ফ্যাশন।
প্রথম দুই বছর প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করে। পরে ঋণ পরিশোধে অনিয়ম শুরু হয়। একপর্যায়ে ব্যাংকের হিসাবে প্রতিষ্ঠানের দায় দাঁড়ায় প্রায় ৯৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ধারাবাহিক অনিয়মের পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঋণটি খেলাপি হয়। পরে সুদ ও অন্যান্য চার্জ যুক্ত হয়ে অর্থঋণ মামলা দায়েরের সময় পাওনা দাঁড়ায় ১২৩ কোটি ৫৯ লাখ ৭৪ হাজার ৪১৯ টাকা।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের দাবি, সংকট বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটিকে ঋণ নবায়ন, বর্ধিতকরণ ও পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব সুযোগের পরও ঋণ পরিশোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ঋণ রেখে সপরিবারে কানাডায়
ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০২৩ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৪ সালের শুরুর দিকে মেরাজ-ই-মোস্তফা কায়সারসহ পরিবারের সদস্যরা কানাডায় চলে যান। এর আগে ঋণ পরিশোধের বিষয়ে ব্যাংকের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল বলে জানা গেছে।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ব্যবসায়িক সংকটের কথা জানিয়ে ঋণ পরিশোধের জন্য সময় নেওয়ার পর একপর্যায়ে কারখানা বন্ধ করে মালিকপক্ষ দেশ ছাড়ে। এরপর পাওনা আদায়ে কার্যকর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তবে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেরাজ-ই-মোস্তফার দাবি, কারখানার মালিকানা নেওয়ার পর রিনোভেশনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয় এবং প্রায় এক বছর উৎপাদন বন্ধ ছিল। পরে প্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স সার্টিফিকেট না পাওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়।
৪০ কোটি টাকায় প্রকল্প কেনা
মেরাজ-ই-মোস্তফার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে তিনি তাঁর বাবা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে এনএলজেড ফ্যাশনের প্রকল্পটি কিনে নেন। এর আগে প্রকল্পটি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পিএলসির একজন পরিচালক মো. জাহেদুল হক প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করতেন।
রিনোভেশন শেষে ২০১৮ সালে উৎপাদন শুরু হলেও ভালো ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রায় দেড় বছর ব্যবসা চালানোর পর করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা আসে। ২০২০ সালে বিভিন্ন ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে যায়। এসব অর্ডারের বিপরীতে আগে থেকেই আমদানি করা কাঁচামাল কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে লোকসান হয় বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।
করোনার ধাক্কা কাটতে না কাটতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব পড়ে তৈরি পোশাক খাতে। উৎপাদন ও বিক্রিতে সংকট বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকের সুদ ও দায়ও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে কারখানা বন্ধ হয়ে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
১৩টি চেক প্রত্যাখ্যান মামলা
ঋণ আদায়ে এনএলজেড ফ্যাশনের কর্ণধার ও সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের বিরুদ্ধে ১৩টি এনআই অ্যাক্টের মামলা করেছে ওয়ান ব্যাংক। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এসব মামলা করা হয়। মামলাগুলো বর্তমানে আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ে বিচারাধীন।
এরপর ব্যাংক অর্থঋণ আদালতে মামলা করে। সেই মামলায় মেরাজ-ই-মোস্তফা কায়সার, তাঁর মা হোসনে আরা বেগম, স্ত্রী তাবাস্সুম করিম এবং চাচা মোহাম্মদ মনজুরুল আলমকে বিবাদী করা হয়।
এনএলজেড ফ্যাশন লিমিটেড চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা সিইপিজেডে অবস্থিত শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধিত হয়। জ্যাকেট, প্যান্ট ও শার্টসসহ ওভেন পোশাক উৎপাদন করত প্রতিষ্ঠানটি। মাসে এর উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ৪২ হাজার ডজন।
মেরাজ-ই-মোস্তফা ২০২১-২০২২ মেয়াদে বিজিএমইএর পরিচালক নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর বাবা মোহাম্মদ শাহজাহান বিজিএমইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক ছিলেন।
ফ্যামিলিটেক্সে খেলাপি ৪৯ কোটি
একই পরিবারের আরেক প্রতিষ্ঠান ফ্যামিলিটেক্স (বিডি) লিমিটেডের কাছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৪৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে।
ঋণ আদায়ে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অর্থঋণ আদালতে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার ব্যবস্থাপক সালামত উলাহ বলেন, ফ্যামিলিটেক্সের ঋণটি খেলাপি হওয়ায় ব্যাংকের পাওনা আদায়ে আইনগত ও প্রচলিত প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বন্ধকী সম্পত্তি ও সংশ্লিষ্ট সম্পদের মাধ্যমে পাওনা আদায়ের উদ্যোগ রয়েছে।
এদিকে গত ৩০ জুন বেপজা ফ্যামিলিটেক্সের চট্টগ্রাম ইপিজেডের কারখানা, ভবন, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম নিলামে বিক্রির দ্বিতীয় দফা বিজ্ঞপ্তি দেয়। আগ্রহী দরদাতাদের ৬ আগস্টের মধ্যে বিড জমা দিতে বলা হয়। কারখানা চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে—এমন দরদাতাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
শেয়ারবাজারে আলোচিত-সমালোচিত
ফ্যামিলিটেক্স ২০০৩ সালে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতে যাত্রা শুরু করে। ২০১৩ সালে আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিক লোকসানে পড়ে। ২০২১ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটির কারখানা ও অফিস বন্ধ পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের তদন্তে ২০১৫ সাল থেকে পরিচালকদের ঘোষণা ছাড়াই শেয়ার বিক্রির অভিযোগ ওঠে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে স্পন্সর ও পরিচালকদের হাতে থাকা শেয়ারের পরিমাণ নেমে আসে প্রায় ৪ দশমিক ০২ শতাংশে। অথচ আইপিওর সময় তাদের হাতে ছিল প্রায় ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ শেয়ার।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে বিএসইসি পাঁচজন স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ দিয়ে পর্ষদ পুনর্গঠন করলেও স্পন্সর শেয়ারহোল্ডারদের অসহযোগিতার কারণে তারা কার্যকরভাবে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেননি। পরে কয়েকজন স্বাধীন পরিচালক পদত্যাগ করেন।
দুই ব্যাংকের পাওনা ১৭২ কোটি
এনএলজেড ফ্যাশনের ১২৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং ফ্যামিলিটেক্সের ৪৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা মিলিয়ে একই পরিবারের দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে দুই ব্যাংকের মোট পাওনা প্রায় ১৭২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
একদিকে এনএলজেড ফ্যাশনের কারখানা বন্ধ, মালিকপক্ষের বিদেশে অবস্থান এবং ১২৩ কোটি টাকার বিপরীতে মাত্র প্রায় দুই কোটি টাকার জামানত। অন্যদিকে ফ্যামিলিটেক্সের কারখানা, ভবন, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আদালতের ৬০ দিনের নির্দেশের পর এখন ওয়ান ব্যাংকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ১২৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা আদায়। একই সঙ্গে ফ্যামিলিটেক্সের প্রায় ৪৯ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ উদ্ধারে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও বেপজার উদ্যোগ কতটা সফল হয়, সেটিও দেখার বিষয়। সব মিলিয়ে সপরিবারে দেশত্যাগ, বন্ধ কারখানা, স্বল্প জামানত ও পুঁজিবাজারের নানা অভিযোগের মধ্যে ১৭২ কোটি টাকার ঋণ আদায়ই এখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর বড় পরীক্ষা।



















































