পৃথিবী আজ এক ভয়াবহ জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি। শিল্পায়ন ও আধুনিকতার দৌড়ে আমরা ভুলে গিয়েছি আমাদের অস্তিত্বের উৎস এই ধরণীকে। প্রতি বছর ২২ এপ্রিল ‘বিশ্ব ধরিত্রী দিবস’ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সময় ফুরিয়ে আসছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য এই দিবসটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের এক বার্তাবহ দিন।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রধানত দায়ী উন্নত বিশ্বের লাগামহীন কার্বন নিঃসরণ। তাই ধরিত্রী রক্ষায় সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা তাদেরই। ২০৫০ সালের মধ্যে ‘নেট জিরো’ বা শূন্য কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে কেবল প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না, বরং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একইসাথে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলারের জলবায়ু তহবিল নিশ্চিত করতে হবে। এই তহবিল কোনো ঋণ নয়, বরং এটি উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়ের ক্ষতিপূরণ। এছাড়া পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং অভিযোজন কৌশলগুলো অনুন্নত দেশগুলোর কাছে সহজলভ্য করা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের সামগ্রিক জলবায়ু ঝুঁকির একটি বড় অংশ দৃশ্যমান হয় বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে। এ শহর আজ পাহাড় নিধন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বিমুখী সংকটে জর্জরিত। আমাদের করণীয়গুলো তাই হতে হবে সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী।
চট্টগ্রামের প্রাণ হিসেবে পরিচিত পাহাড়গুলো আজ নির্বিচারে কাটা হচ্ছে। এর ফলে বর্ষায় পাহাড় ধসের মতো বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। ধরিত্রী রক্ষায় এই পাহাড় নিধন কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে এবং কৃত্রিম বনায়ন নয়, বরং প্রাকৃতিক বনভূমি পুনরুদ্ধার করতে হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকা ও বন্দর সংকটের মুখে। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং ম্যানগ্রোভ জাতীয় বনায়নের মাধ্যমে সমুদ্রের লোনা পানির প্রবেশ ঠেকাতে হবে। প্রকৃতির রক্ষাকবচ সুন্দরবন ও উপকূলীয় বনভূমি রক্ষা আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। নগরীর কর্ণফুলী নদী আজ পলি ও প্লাস্টিক বর্জ্যে মৃতপ্রায়। নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে ‘জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাওয়া শহর’ হিসেবে চট্টগ্রামের সংকট আরও ঘনীভূত হবে। শিল্প-কারখানায় ইটিপি নিশ্চিত করা এবং প্লাস্টিক দূষণ রোধে শূন্য সহনশীলতা প্রদর্শন করতে হবে। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে কেবল দিবসভিত্তিক না রেখে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। পাশাপাশি সৌর ও বায়ু শক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে।
ধরিত্রী কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা জাতির নয়, এটি আমাদের সবার অভিন্ন ঘর। বিশ্বনেতাদের দূরদর্শী নীতি এবং আমাদের স্থানীয় পর্যায়ের সচেতনতাই পারে এই পৃথিবীকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে রেখে যেতে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের মতো ভৌগোলিক গুরুত্বসম্পন্ন এলাকায় পরিবেশ রক্ষায় গাফিলতি করার কোনো সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই। প্রকৃতি যখন প্রতিশোধ নেয়, তখন তা কোনো মানচিত্র বা সীমানা দেখে নেয় না। তাই প্রকৃতিকে বাঁচিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে। আজকের ধরিত্রী দিবসে এটাই হোক আমাদের মূল অঙ্গীকার।
মতামত সম্পাদকীয়





















































