এ মুহূর্তের সংবাদ

ছয় দফা না মানলে বৃহত্তর আন্দোলন

লালদিঘিতে ১১ দলের হুঁশিয়ারি

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান

নিজস্ব প্রতিনিধি »

গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নসহ ছয় দফা দাবি আদায়ে ১১ দলীয় জোটের ঢাকা–চট্টগ্রাম লংমার্চের সমাপনী সমাবেশে সরকারের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন জোটের শীর্ষ নেতারা।

---------

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তারা বলেন, জনগণের দাবি উপেক্ষা করা হলে আন্দোলনের পরিধি আরও বাড়বে। প্রয়োজনে ছয় দফা এক দফায় পরিণত হয়ে সরকারবিরোধী বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ নিতে পারে বলেও বক্তব্যে উঠে আসে।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, লংমার্চটি সরকারকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য। তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ছয় মাস পার হয়ে গেছে, কিন্তু জনগণের প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট রয়েছে, অথচ জনগণকে বিল দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নিয়েও তিনি সরকারের সমালোচনা করেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা কাউকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করার জন্য আন্দোলন শুরু করেননি। তবে সরকার যদি এমনভাবে কাজ করতে থাকে যাতে তাদের বিদায় নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে বিরোধী দল চুপ করে থাকবে না। তিনি বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করতেই হবে এবং এ দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না। প্রয়োজন হলে আরও বড় আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, জনগণ যে পরিবর্তনের আশা নিয়ে ভোট দিয়েছে, তার প্রতিফলন ঘটেনি। জনগণ চেয়েছিল চাঁদাবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত একটি রাষ্ট্র। একই সঙ্গে তিনি অতীতের হত্যাকাণ্ড, গুম, আয়নাঘর এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।

নাহিদ ইসলামের কঠোর সতর্কবার্তা

এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে বলেন, অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে সরকারকে জনগণের সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দিতে হবে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার যদি স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া সমস্যাগুলো সমাধান করতে না পারে, তাহলে জনগণের কাছে তা স্বীকার করতে হবে এবং বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। তার অভিযোগ, সংসদকে কার্যকর না করার কারণেই রাজনৈতিক আন্দোলন রাজপথে গড়িয়েছে।

নাহিদ ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়নি। বিরোধী দলকে সংসদে যথাযথ রাজনৈতিক পরিসর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার এককভাবে দেশ পরিচালনার পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে দেশ পরিচালনা করুক।

তিনি বলেন, তারা যেমন অতীতের স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তন চান না, তেমনি বাংলাদেশে নতুন কোনো স্বৈরাচারও তৈরি হতে দেবেন না। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি সতর্ক করে বলেন, তার বাবার ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন তিনি না করেন।

গণভোটের রায় নিয়ে মামুনুল হকের হুঁশিয়ারি

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক বলেন, গণভোটে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই রায় বাস্তবায়নে কোনো ধরনের ছলচাতুরি মেনে নেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, বর্তমান আন্দোলনের তৃতীয় ধাপ শুরু হয়েছে। গণভোটের আগে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে সংস্কারের আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।

তবে তিনি বলেন, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য সরকার পতন নয়; বরং সরকারকে সতর্ক করা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বাধ্য করা। সংস্কারের দাবি উপেক্ষা করা হলে সরকারকে একসময় চলে যেতে হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

ছয় দফা এক দফায় পরিণত হওয়ার হুঁশিয়ারি

এনসিপির নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, জনগণের দাবি আদায়ে বর্তমানে ছয় দফা নিয়ে আন্দোলন চলছে। এসব দাবির বিষয়ে সরকার জবাবদিহি করতে ব্যর্থ হলে ছয় দফা এক দফা দাবিতে পরিণত হবে।

তিনি বিএনপির নেতাকর্মীদের নিজেদের দলের মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের কাছে গিয়ে জনগণের ওপর কথিত জুলুমের কারণ জানতে আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে থাকা মানুষের দাবিকে সামনে রেখেই লংমার্চ করা হয়েছে। প্রয়োজনে ঢাকায় গিয়ে কর্মসূচি পালন করার জন্যও তিনি নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।

বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে সারজিসের আক্রমণ

এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ক্ষমতায় আসার ছয় মাসের মধ্যেই সরকার “চোরাবালিতে” পড়ে গেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে লুটপাট, চাঁদাবাজি ও দখলদারির মাধ্যমে অরাজকতা তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলের ওপর দায় চাপিয়ে সরকারের নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা জনগণ আর মেনে নেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সারজিস আলম বলেন, বিএনপি বিরোধী দলে থাকাকালে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল। এখন ক্ষমতায় এসে তাদের সেই অবস্থানের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই বলে তিনি অভিযোগ করেন।

জনতার বিস্ফোরণের সতর্কবার্তা

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ বলেন, দেশের পরিস্থিতি বিস্ফোরণমুখী। জনগণ রাস্তায় নামলে ১১ দলীয় জোটের ঐক্যেরও প্রয়োজন হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সংকট নেই বলা হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষ সংকটে রয়েছে। জ্বালানি ও সার সংকট অব্যাহত থাকলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়ে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, দখলদারি, চাঁদাবাজি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়েও তিনি সরকারের সমালোচনা করেন। তার আহ্বান—জনতার বিস্ফোরণের আগে গণদাবি মেনে নিতে হবে।

মঞ্জুর অভিযোগ

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার পর রাজনৈতিক বন্ধুরা আগের প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে গেছেন।
তিনি বলেন, তারা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে কোনো ক্যাম্পাসে হল দখল হবে না, নির্যাতন হবে না এবং কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হবেন না। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।

বিদ্যুৎ-গ্যাস ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে আসিফ মাহমুদ

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, মানুষের ঘরে আবার হারিকেন-মোমবাতি ফিরে এসেছে এবং কোথাও লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। তার অভিযোগ, বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, অথচ সবকিছুর দাম বেড়েছে।

তিনি সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, মানুষের মৌলিক সমস্যার সমাধান না করে শুধু কার্ড বা নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সমাবেশে যারা উপস্থিত ছিলেন

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী ড. কর্নেল অলি আহমদ। এসময় উপস্থিত ছিলেন—বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ কে এম হামিদুর রহমান আজাদ, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালাল উদ্দীন আহমদ, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, লেবার পার্টির মুখপাত্র মাওলানা নাজমুল ইসলাম তালুকদার, গুমের শিকার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান বীরপ্রতীক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মুহাম্মদ ফয়সাল এবং এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

উল্লেখ্য, ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে ঘোষিত ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- অবিলম্বে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ও অপরাধ দমন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ।