সুপ্রভাত ডেস্ক »
‘আমার বয়স যখন মাত্র ছয়-সাত বছর, তখন বাবা প্যারালাইজড হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। পাঁচ সদস্যের পরিবারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের কাঁধে।
ছোট একটি মুদি দোকান আর ছাগল পালনের সামান্য আয় দিয়েই কোনোভাবে সংসার চলত। অভাবের কারণে নবম শ্রেণি থেকেই রাজমিস্ত্রির কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে গেছি। অনেক কষ্ট আর অমানুষিক পরিশ্রমের পর আজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছি।’
নিজের যাপিত জীবনের সংগ্রামের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে এভাবেই বলছিলেন রিয়াদ মালিথা (ডাকনাম তুহিন)। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমের জোরে তিনি ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছেন। গত ৩ মে বিভাগে নিজের প্রথম ক্লাসটিও করেছেন তিনি।
রিয়াদের বাড়ি পাবনা সদর উপজেলার নেয়ামতুল্লাহপুর গ্রামে। বাবা তফর মালিথা ও মা রহিমা খাতুনের তিন সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।
অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মায়ের আয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও, কিশোর রিয়াদ দ্রুতই বুঝতে পারেন পরিবারের হাল তাকেই ধরতে হবে। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই নবম শ্রেণিতে ওঠার পর গ্রামের এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে রাজমিস্ত্রির জোগালি (শ্রমিক) হিসেবে কাজ শুরু করেন।
দিনে হাড়ভাঙা খাটুনি আর রাতে পড়াশোনা— এভাবেই চলতে থাকে তার জীবনযুদ্ধ। কঠোর পরিশ্রমের মাঝেও পড়াশোনা চালিয়ে যান সমানতালে।
রাধানগর মজুমদার একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০২৩ সালে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৩.৯৪ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। পরে বেসরকারি পাবনা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে ২০২৫ সালে জিপিএ ৪.৪২ পেয়ে এইচএসসি সম্পন্ন করেন।
মায়ের স্বপ্ন ও বাস্তবতার কষাঘাত
মা রহিমা খাতুন দিন-রাত এক করে পরিশ্রম করেছেন সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিতে আর তাদের মানুষ করতে। মুদি দোকান ও ছাগল পালনের আয়ের মাঝেও তিনি স্বপ্ন দেখতেন— ছেলে রিয়াদ একদিন পড়াশোনা শেষ করে একটি ভালো চাকরি করবে। গ্রামের কয়েকজনকে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরি করতে দেখে তার মনেও এমন স্বপ্ন জাগে। তিনি ভাবতেন, ছেলেকে এইচএসসি পর্যন্ত পড়াতে পারলে পরিচিতদের মাধ্যমে কোনোভাবে একটা চাকরির ব্যবস্থা করবেন।
অভাব-অনটনের মধ্যেও তিনি সাহস করে ছেলেকে রাধানগর মজুমদার একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজে নবম শ্রেণিতে ভর্তি করান। কিন্তু পাঁচ সদস্যের পরিবারের ভার বহন করা তার জন্য ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। তখনই রিয়াদ রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন এবং নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই জোগাতে থাকেন। এমনকি নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার ফিও তিনি নিজের উপার্জনের টাকায় পরিশোধ করেন।
তবে, একদিকে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম, অন্যদিকে বিজ্ঞান বিভাগের কঠিন পড়াশোনা— দুটোর ভারসাম্য রাখা সহজ ছিল না। কাজের চাপের কারণে এসএসসি পরীক্ষার ফল রিয়াদের প্রত্যাশামতো হয়নি। এই ফলে রিয়াদ মনে মনে এক ধরনের জেদ অনুভব করেন। তিনি দেখতেন, তার বন্ধুরা ভালো ফল করে ভালো কলেজে ভর্তি হয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করছে, আর তিনি দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছেন রোদে পুড়ে, শ্রমিকের কাজ করে। এই বাস্তবতা তাকে ভেঙে দেয়নি, বরং আরও দৃঢ় করেছে। তিনি সংকল্প করেন, ‘কাজ শেষ করে যতটুকু সময় পাব, ততটুকুই মন দিয়ে পড়ব। আমাকে ভালো কিছু করতেই হবে।’
কথোপকথন ও নতুন স্বপ্ন
এক দিন পাবনা টার্মিনাল সংলগ্ন একটি নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করছিলেন রিয়াদ। নিচতলা থেকে মাথায় করে বালি ও খোয়া ওপরে তুলছিলেন। কাজের ফাঁকেই হঠাৎ তার কানে ভেসে আসে এক মধ্যবয়সী নারীর কথা। তিনি প্রতিবেশী এক ছেলেকে বলছিলেন, ‘তুমি যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাও, তাহলে তোমার ১২ বছরের পড়াশোনা সার্থক হবে।’
এই কথাগুলো রিয়াদের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। সেদিন থেকেই তার মনেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দানা বাঁধতে শুরু করে। কলেজের প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার দুই মাস আগে, রোজার মাসে রিয়াদ সিদ্ধান্ত নেন কিছুদিন কাজ থেকে বিরতি নিয়ে পড়াশোনা করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া দুই ভাইয়ের পরামর্শে তিনি নতুনভাবে প্রস্তুতি শুরু করেন। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) এক বড় ভাই তাকে সাহস দিয়ে বলেন, ‘তোমার এই রেজাল্ট নিয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া সম্ভব।’ সেই উৎসাহে রিয়াদের মনে নতুন আশা জাগে।
তবে, পথটি সহজ ছিল না। প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শেষে তাকে আবার কাজে ফিরতে হয়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া আরেক বড় ভাইয়ের পরামর্শে ভর্তি পরীক্ষার কিছু বই কিনলেও, সারাদিনের কাজ শেষে পড়ার শক্তি বা সময় সবসময় থাকত না।
দুর্ঘটনা ও মায়ের অদম্য মনোবল
সব বাধা পেরিয়ে রিয়াদ পাবনা শহরে থেকে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু কোচিং ও থাকার খরচ চালানো ছিল দুঃসাধ্য। মা রহিমা খাতুন ছেলের স্বপ্নের জন্য আত্মীয়স্বজনের কাছে হাত পাতেন এবং শেষ পর্যন্ত মামার কাছ থেকে প্রায় ৫০-৬০ হাজার টাকা ধার করেন। মাকে অনেক বুঝিয়ে রিয়াদ বলেছিলেন, ‘এই কয়েক মাস কষ্ট করলে হয়তো আমাদের পুরো জীবন বদলে যেতে পারে।’
পাবনা শহরের একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে রিয়াদ নতুন উদ্যমে প্রস্তুতি শুরু করেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, কিছুদিন পরেই নেমে আসে নতুন বিপর্যয়। এক দিন কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে পা পিছলে পড়ে গিয়ে রিয়াদের হাত ভেঙে যায়। এই খবর শুনে তার মায়ের আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে কোচিংয়ের জন্য ধার নেওয়া টাকা থেকেই ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়।
এই চরম হতাশাজনক পরিস্থিতিতে রিয়াদ সিদ্ধান্ত নেন আর পড়াশোনা করবেন না। তিনি মাকে বলেছিলেন, ‘আমি আর পড়ব না। এত কষ্টের মধ্যে এটা সম্ভব না।’ কিন্তু মা রহিমা খাতুন ছেলের স্বপ্ন এভাবে ভেঙে যেতে দিতে রাজি ছিলেন না। তিনিই জোর করে রিয়াদকে আবার পড়াশোনা শুরু করান। মায়ের অদম্য মনোবল দেখে রিয়াদও নতুন করে সাহস সঞ্চয় করেন।
তিনি ভাবলেন, ‘যদি তিন মাস মন দিয়ে পড়তে পারি আর বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাই, তাহলে আর রাজমিস্ত্রির কাজ করা লাগবে না।’
অবশেষে সব বাধা জয় করে রিয়াদ আজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।




















































