এ মুহূর্তের সংবাদ

মেগা প্রকল্পের বদলে সামাজিক সুরক্ষায় বেশি মনোযোগী সরকার

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী

সুপ্রভাত ডেস্ক »

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, পিকেএসএফ বর্তমানে যে দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করছে তা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং তাদের এই ভূমিকা সরকারের বর্তমান অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ।

বর্তমান সরকার এখন মেগা প্রকল্পের বদলে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

আমির খসরু বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কতগুলো কঠোর মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক নির্ধারণ করেছে। বিগত দিনের দুর্নীতি ও অপচয়ের পরিপ্রেক্ষিতে এখন থেকে যে কোনো প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে তার ভ্যালু, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা এবং পরিবেশগত প্রভাবকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, সরকারি টাকা মানেই জনগণের ট্যাক্সের টাকা, তাই প্রতিটি প্রকল্পের পেছনে সুনির্দিষ্ট চিন্তাভাবনা, আউটপুট এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে থাকা প্রায় ১৩০০ প্রকল্পের অনেকগুলোতেই কোনো রিটার্ন বা কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই এবং পরিবেশগত দিক বিবেচনা করা হয়নি বলে সেগুলো সরকার বাতিল করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সরকারের মূল স্লোগান হলো অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ বা ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি। শুধু রাজনীতিতে গণতন্ত্র থাকলে চলবে না, অর্থনীতিতেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমির তিনটি প্রধান স্তম্ভের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমত, বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, অর্থনীতির সুফল বা বেনিফিট সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তৃতীয়ত যারা সবসময় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাইরে ছিল তাদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা। যদিও বাংলাদেশে এই কাজ করা অত্যন্ত কঠিন, তবুও সরকার সাহসের সঙ্গে এই পথেই এগোচ্ছে। সরকার এখন মেগা প্রকল্পের বদলে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। যাতে বিশেষ গোষ্ঠীর বদলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হয় বলে জানান তিনি।

সামাজিক ক্ষমতায়নের উদাহরণ দিতে গিয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ফ্যামিলি কার্ডের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পরিবারের নারীরা সারাদিন কাজ করলেও তাদের যথাযথ স্বীকৃতি থাকে না। সরকার এখন ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি মহিলাদের হাতে টাকা পৌঁছে দিচ্ছে, যাতে পরিবার ও সমাজে তাদের ক্ষমতায়ন ঘটে। মহিলারা সাশ্রয়ী এবং তারা জানেন কীভাবে সংসার চালাতে হয়। এই নগদ অর্থ লোকাল ইকোনমিতে ডিমান্ড তৈরি করবে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করবে। একইভাবে কৃষকদের জন্য সরাসরি কার্ডের মাধ্যমে সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে যাতে তারা বীজের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো অনায়াসেই মেটাতে পারেন।

জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয় (আউট অফ পকেট এক্সপেন্ডিচার) আফগানিস্তানের চেয়েও বেশি, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। এই পরিস্থিতি বদলে সরকার ইউনিভার্সাল হেলথকেয়ার এবং প্রাইমারি হেলথকেয়ারের ওপর জোর দিচ্ছে, যার প্রতিফলন আগামী বাজেটে দেখা যাবে।

দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, কামার, কুমার, তাঁতি বা হস্তশিল্পের সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা বছরের পর বছর কাজ করলেও তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে না। সরকার এখন এই সৃজনশীল খাতের উদ্যোক্তাদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট, ডিজাইনিং সাপোর্ট এবং ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে আমাজন বা আলিবাবার মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যেতে চায়।

তিনি বরিশালের শীতল পাটির উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি নির্দিষ্ট ডিজাইনের কারণে একটি পণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। থাইল্যান্ডের ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ ধারণার মতো বাংলাদেশেও গ্রামভিত্তিক পণ্য উৎপাদন এবং কালেকশন সেন্টারের মাধ্যমে তা সরাসরি বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পিকেএসএফ এই উদ্যোগগুলোতে সরকারের বড় সহযোগী হতে পারে।

মন্ত্রী সংস্কৃতি ও ক্রীড়া খাতকেও জিডিপিতে কন্ট্রিবিউট করার মতো শক্তিশালী শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেন। তিনি বলেন, থিয়েটার বা স্টেডিয়ামে মানুষ যখন টিকিট কেটে খেলা দেখতে যায়, তখন সেটিও জিডিপির অংশ। ইউকে-র থিয়েটার ডিস্ট্রিক্টের মতো আমাদের দেশেও লাইটম্যান, মেকাপ ম্যান এবং ডিজাইনারদের সমন্বয়ে একটি বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে তোলা সম্ভব।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক বোঝা বয়ে নিয়েও বর্তমান সরকার দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়ন কোনো একটি দলের নয় বরং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিষয়। পিকেএসএফের কার্যক্রম সরকারের দর্শনের সাথে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ হওয়ায় এই প্রতিষ্ঠানকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দেন মন্ত্রী।