মার্চ-এপ্রিল-মে মাসে সুন্দরবনে কেন আগুন লাগে?

সাধন সরকার »

গত ২০ বছরে সুন্দরবনে এ পর্যন্ত ২৩ বার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত ৩ মে সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দাসের ভারানী এলাকায় আগুন লাগে। তথ্য অনুযায়ী আগুনে তিন একরের বেশি বনভূমি পুড়ে গেছে। বন বিভাগের সূত্র মতে, ওই এলাকায় লতাগুল্ম বেশি থাকার কারণে আগুনে শুকনো পাতায় বেশি পুড়েছে, বড় গাছের তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে জানা গেছে, পুড়ে যাওয়া স্থানে লতাপাতা ও গুল্ম জাতীয় সিংড়া ও বলা গাছ বেশি ছিল। সিংড়া ও বলা গাছ ম্যানগ্রোভ বনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ। আগুন লাগার এ স্থান ছিল পাখিদের আশ্রয়স্থল। নানা ধরনের কীটপতঙ্গ, শামুক, ব্যাঙ ও পাখির বিচরণ এখানে লেগেই থাকতো।
সুন্দরবন এক জটিল বাস্তুসংস্থান। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অণুজীব, ছোট-বড় উদ্ভিদ ও প্রাণীর সমন্বয়ে এক বৃহৎ খাদ্যশৃঙ্খল তৈরি হয়েছে এখানে। সুতরাং বনের কোথাও আগুন লাগলে সে স্থানের খাদ্যশৃঙ্খল এলোমেলো হয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি বনের ধানসাগর এলাকায় আগুন লাগে। বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে সুন্দরবনে ঠিক মার্চ-এপ্রিল-মে মাসের সময়টা এলেই আগুন লাগে। প্রাকৃতিক কারণকে যতটা দায়ী করা হয় আগুন লাগার ঘটনা যেন তার চেয়ে বেশি পরিকল্পিত!
২০০২ সালের ২২ মার্চ শরণখোলা রেঞ্জের কটকা অভয়ারণ্যে আগুন লাগে। পাশাপাশি একই রেঞ্জের নাংলী ও মান্দারবাড়িয়া রেঞ্জে আগুন লাগে দুইবার। ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ আগুনে পুড়ে যায় চাঁদপাই রেঞ্জের নাংলী ক্যাম্পের বন। ২০০৫ সালে ৮ এপ্রিল চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের কলমতেজী এলাকায় আগুন লাগে। একই সালের ১৩ এপ্রিল চাঁদপাই রেঞ্জের তুলাতলার বন পুড়ে যায়। ২০০৬ সালে সবচেয়ে বেশিবার বনে আগুন লাগে। ২০০৬ সালের ৯ মার্চ, ১১ এপ্রিল, ১২ এপ্রিল, পহেলা মে ও ৪ মে সুন্দরবনের তেড়াবেকা, আমুরবুনিয়া, খুরাবাড়িয়া, পচাকোড়ালিয়া ও ধানসাগর এলাকায় আগুন লাগে। ২০০৭ সালের ১৫ জানুয়ারি, ১৯ মার্চ ও ২৮ মার্চ সুন্দরবনের পচাকোড়ালিয়া, নাংলী ও ডুমুরিয়া রেঞ্জে আগুন লাগে। ২০১০ সালের ২০ মার্চ গুলিশাখালীতে আগুন লাগে। ২০১১ সালের ১ ও ৮ মার্চ সুন্দরবনের নাংলীতে দুবার আবার আগুন লাগে। ২০১৪ সালের ২৫ মার্চ গুলিশাখালীতে আবারো আগুন লাগে। ২০১৬ সালে ২৭ মার্চ থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত নাংলী, পচাকোড়ালিয়া ও তুলাতলায় এলাকায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালের ২৬ মে সুন্দরবনের মাদ্রাসারছিলায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। মোট ২৩ বার আগুন লাগার ফলে সুন্দরবনে ৭২ একরের বেশি বনভূমি উজাড় হয়ে গেছে।
আগুন লাগার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে সবচেয়ে বেশি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এ প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে মার্চ-এপ্রিল-মে মাসের এই সময়ে কেন বারবার সুন্দরবনে আগুন লাগে? কেন শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে বারবার আগুন লাগার ঘটনা ঘটে? শুষ্ক মৌসুমে মার্চ-এপ্রিল-মে মাসে বন কর্মকর্তাদের আরো বেশি সতর্ক হতে হবে। এ সময়ে কেউ যাতে বনের শরণখোলা, চাঁদপাই রেঞ্জ ও আশপাশ এলাকায় আগুন লাগাতে না পারে সেক্ষেত্রে এসব এলাকায় বনকর্মীদের টহল বাড়ালে বনে আগুন লাগা কমে যাবে বলে মনে করি। মাছ, গোলপাতা ও মধু সংগ্রহ করতে যাওয়া বনজীবীদের ফেলে দেওয়া বিড়ি-সিগারেটের আগুন, মৌয়ালদের ফেলে দেওয়া মশাল, মাছ ধরার সুবিধার্থে স্থানীয়দের লতাগুল্ম পরিষ্কার করার জন্য ইচ্ছে করে আগুন লাগার মতো বিষয়গুলো থেকে সুন্দরবনে আগুন লাগার মতো ঘটনা ঘটছে।
তবে বনে আগুন লাগার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক কারণও উড়িয়ে দেওয়া যায় না! অনেক সময় গাছের পাতা পড়ে পুরু স্তর তৈরি হয়। জোয়ারের পানিতে পাতা পচে সেখান থেকে মিথেন গ্যাস তৈরি হয়। মিথেন গ্যাস থেকেও আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। সুন্দরবনের টহল ফাঁড়ির নিকটবর্তী এলাকায় ভোলা নদী প্রায় মরে গেছে। সুন্দরবনের ছোটখাটো অনেক নদী ও খাল মরে যাওয়ার কারণে অনেক এলাকা শুকিয়ে গেছে। নদী-জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ার কারণে শুষ্ক অঞ্চল আগুনের সূত্রপাতে সহায়তা করছে। বারবার বনে আগুন লাগার ক্ষেত্রে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশও আগুন লাগা বন্ধের ক্ষেত্রে মানা হয়েছে বলে মনে হয় না। বারবার আগুন লাগার স্থানে বনকর্মীদের টহল জোরদার, দ্রুত আগুন নেভানোর জন্য রিভার ফায়ার স্টেশন তৈরি, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ, সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে বেড়া নির্মাণ, বনসংলগ্ন ভরাট হয়ে যাওয়া ভোলা নদী ও খাল পুনঃখনন ইত্যাদি সুপারিশ করা হলেও তার বেশিরভাগই মানা হয়নি। সুপারিশ আমলে না নিলে আগুন লাগার পর কমিটি গঠন করে লাভ কি? সুন্দরবনে বনজীবীদের প্রবেশ বন্ধ করে তাদের বিকল্প জীবিকায়নের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
সুন্দরবন বিশে^র সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন। বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠা প্রাকৃতিক বনভূমি পৃথিবীর জন্য এক বিস্ময়। ১৯৯২ সালে সুন্দরবন রামসার স্থান হিসেবে বিশ^ স্বীকৃতি লাভ করে। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে সুন্দরবন ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ^ ঐহিত্যবাহী স্থানের মর্যাদা পায়। সুন্দরবন বিশ^ পর্যটন এলাকা। বিশে^র বুকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে সুন্দরবন। ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষায় সুন্দরবন রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। সুন্দরবনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠা সুন্দরবনকে তার মতো করে থাকতে দিতে হবে। সুন্দরবনের নদ-নদী ভরাট হয়ে গেলে তা বনের উপর সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। প্রাকৃতিকভাবে যদি বনে আগুন লাগে সেটা বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বনে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মার্চ-এপ্রিল-মে মাসে (বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে বেশিরভাগ আগুন লেগেছে এই সময়টাতে) বারবার আগুন লাগার স্থানে টহল জোরদার করলে সুন্দরবনে আগুন লাগার ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করি। সুন্দরবন ভালো থাকলে বাংলাদেশও ভালো থাকবে। তাই আমাদের স্বার্থে সুন্দরবনকে সব ধরনের দুর্যোগ থেকে আগলে রাখতে হবে।

লেখক : পরিবেশ কর্মী, কলামিস্ট
ংধফড়হংধৎশবৎ২০০৫@মসধরষ.পড়স