মাসুদ পারভেজ রূপাই >>
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ ‘শঙ্খমালা’ কবিতার শেষ লাইনে লিখেছেন অমর এক লাইন- এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়নাকো আর। অর্থাৎ এটাই শেষ। আর্জেন্টাইন মহাতারকা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার লিওনেল মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছে। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষে যখন বুটজোড়া তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন মেসির পাশে জ্বলজ্বল করছে অজস্র রেকর্ড। দেশের হয়ে সর্বোচ্চ গোল, সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট, অসংখ্য শিরোপা আর দেশকে ভালোবাসার চূড়ান্ততম নিদর্শন। ভালোবাসা ও একাগ্রতার কথা আসছে, কারণ মেসির কাছে সুযোগ ছিল স্পেনকে বেছে নেওয়ার। বরং সেটাই সেই সময়ে তার জন্য বুদ্ধিমত্তার সিদ্ধান্ত হতো। কিন্তু রোজারিও থেকে বার্সেলোনায় আসা ছোট্ট লিওর তো ব্যাগ-ব্যাগেজ কখনোই বন্ধ হয়নি। বরং নানা প্রতিকূল পরিবেশের পরও লিওনেল মেসি আগাগোড়াই একজন আর্জেন্টাইন ছিল। আর সেই মেসি কি-না নিজের জন্মভূমিকে বেছে না নিয়ে স্পেনকে বেছে নিতে পারতো!
দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মেসির উত্থান-পতন স্বাভাবিকভাবেই ছিল। একের পর এক ক্লাবীয় সাফল্য পেলেও জাতীয় দলের হয়ে একটু-আধটুর জন্য শেষ পর্যন্ত শিরোপা জেতা হচ্ছিল না। একের পর এক প্রাণান্তকর চেষ্টার পরও না পারার বেদনা ও অনির্ণেয় হতাশায় মেসি একটা সময় অবসরে গিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাপী কোটি-কোটি ভক্ত-সমর্থক, সমালোচক-বিশ্লেষক মেসিকে ফিরিয়ে এনেছিল ফুটবলের মাঠে। যেখানে স্বপ্ন রচিত হয়, যেখানে আনন্দ-বিনোদনের আখ্যান ছাপিয়ে মানুষ মেতে ওঠে নির্মল মূর্ছনায়। আর সেই মোহনবাঁশির জাদুকর মেসিই অযুত-নিযুত সমর্থককে ভাসিয়েছে অপার আনন্দে। যেন আমাদের মহাত্মা লালন শাহ লিখেছেন- আমি অপার হয়ে বসে আছি… এই অপার হয়ে বসে থাকাটাই আমরা করেছি মেসিকে দেখার জন্য। তাকে খেলতে দেখার জন্য, তার পায়ের জাদু ছাপিয়ে মাথার দুর্দান্ত রসায়নের জন্য কিংবা একটা মুহূর্তের ঝলকের জন্য আমরা ছাতক পাখির মতো অপেক্ষা করেছি। আর সেই মেসি আমাদের হতাশ করেনি। মাঠে ও মাঠের বাইরে আমরা মেসিকে পেয়েছি অপার আনন্দে, নির্মল জোছনায় কিংবা আগুনমুখো ফাগুনের বারুদমাখানো উত্তাপে।
জাতীয় দলের হয়ে আলো ছড়ানোর আগে মেসি অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জিতেছে, দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে দেশকে সোনার পদক এনে দিয়েছে। কিন্তু সিনিয়র ফুটবলের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মেসি প্রথম শিরোপা জিতে ২০২১ কোপা আমেরিকা শিরোপা জেতার মাধ্যমে। ব্রাজিলকে তাদেরই ঐতিহাসিক মারাকানা মাঠে হারিয়ে মেসির জেতা শিরোপাটা আক্ষরিক অর্থেই আনন্দে ভাসিয়েছে রোজারিও থেকে সাহারায়, সুন্দরবন থেকে অ্যামাজনে। তারপর তাকে পিছু তাকাতে হয়নি, একে একে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা জিতে পোক্ত করে নিয়েছে নিজের সিংহাসন। যেখানে নিজের ধারেকাছেও কেউই নেই!
মেসি ফুটবলকে কী দিয়েছে, ফুটবল থেকে মেসি কী পেয়েছে এবং মেসির সময়কালীন আমরা কী পেয়েছি তার হিসাবনিকাশ আরও শত বছর পরও হবে, হতে থাকবে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসবে অমর সব কথামালা, কথার পিঠে কথা এবং মোহাবিষ্টের মোহনীয় দলিলাদি। কিন্তু ফুটবলকে মেসি কী দিয়েছে তার হিসাব করতে যাওয়াটাও বোকামি। কিংবদন্তি কোচ পেপ গার্দিওলা বলেছেন- তাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করো না, বরং তাকে উপভোগ করো। মেসি হচ্ছে সেই বিরলপ্রজ ফুটবলার, যাকে ব্যাখ্যাতীত বলেছেন ফুটবল-বিশ্লেষক, ভক্ত এবং সমালোচকবৃন্দ।
গতকাল মেসি আকাশি-সাদা জার্সিতে নিজের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে। হয়তোবা আর বছর দুয়েক, তারপর সব ধরনের ফুটবল থেকেই নিজের সমাপ্তির সীমারেখা টেনে দেবে। মেসিবিহীন ফুটবল আগের মতো থাকবে না। বরং পানসে ও ম্যাড়মেড়ে মনে হবে অসংখ্য ফুটবল সমর্থকদের। ফুটবলে মেসি যে স্ট্যান্ডার্ড সেট করেছে বছরের পর বছর, ম্যাচের পর ম্যাচ, মৌসুমের পর মৌসুম তা অন্য কোনো ফুটবলারের পক্ষে অতিক্রম করা অসম্ভব। সে কারণেই আমরা আদ্রচোখে বলতে পারি, গাইতে পারি এবং অমোঘবাক্য হিসেবে প্রবোধ দিতে পারি নিজেদেরকেই; এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়নাকো আর…
লিওনেল মেসি, হ্যাপি রিটায়ারমেন্ট। অ্যা ওয়েল ডিজার্ভড রিটায়ারমেন্ট ইউ হ্যাভ আর্নড।




















































