নিজস্ব প্রতিবেদক >>
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে নির্মাণাধীন লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে।
রোববার সকাল ১১টায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় লালদিয়া প্রজেক্ট সাইটে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করেন মাওলানা উবাইদুল্লাহ। পরে শুরু হয় মূল আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল শুধু একটি বন্দর প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের অর্থনীতি মূলত বন্দরের কার্যক্রমকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে। দেশের অর্থনীতিকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মন্ত্রী বলেন, এপি মোলারের বিনিয়োগ বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের বন্দরনগরী নয়, বরং পুরো অঞ্চলের একটি আঞ্চলিক লজিস্টিক হাবে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।
তিনি এপি মোলার কর্তৃপক্ষকে স্থানীয় জনগণের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরির আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানের বন্দর ব্যবস্থাপনার নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ টার্মিনাল পরিচালনার মাধ্যমে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে।
তিনি জানান, এপি মোলার গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) পদ্ধতিতে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই প্রকল্প ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৯৮ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আধুনিক প্রযুক্তি, স্মার্ট ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণের বিকল্প নেই।
তিনি জানান, লালদিয়া টার্মিনাল ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহের সাত দিন পরিচালনাযোগ্য আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন টার্মিনাল হবে। এখানে বড় জাহাজ ভেড়ানো এবং প্রায় ৬ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা থাকবে।
বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, এই প্রকল্প বাংলাদেশের বন্দর খাতে নতুন মানদণ্ড তৈরি করবে।
এর আগে স্বাগত বক্তব্যে এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রমেশ ডেভিড বলেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল বিশ্বের অন্যতম আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর টার্মিনালে পরিণত হবে।
তিনি বলেন, প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৬০০ মিটার দীর্ঘ জেটি নির্মাণ করা হবে। থাকবে ৭টি শিপ-টু-শোর গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩০টি রিমোট অপারেটেড রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং প্রায় ৪৫টি বৈদ্যুতিক ট্রাক।
পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে এই টার্মিনাল বছরে প্রায় ১০ লাখ কনটেইনার পরিচালনা করতে পারবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কনটেইনার পরিচালনা সক্ষমতা প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
তিনি আরও বলেন, লালদিয়া হবে একটি পরিবেশবান্ধব ও শূন্য নির্গমন (Zero Emission) টার্মিনাল। পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
তিনি বলেন, আগামী ৩০ বছর এপি মোলার গ্রুপ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশ হিসেবে কাজ করবে এবং এলাকার মানুষের উন্নয়নে সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিবৃন্দ, এপি মোলার গ্রুপের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল শুধু একটি নতুন টার্মিনাল নয়, এটি বাংলাদেশের সামুদ্রিক যোগাযোগ, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।




















































