নিজস্ব প্রতিবেদক »
রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া প্রকল্প পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আবদুল গফুরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, নানা অনিয়মের দায়ে বরখাস্ত হওয়ার পরও তিনি প্রভাব খাটিয়ে পুনরায় পদ ফিরে পেতে অপতৎপরতা চালাচ্ছেন এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও উসকানিমূলক কর্মকান্ডে জড়িত রয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আতিয়ার রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ডের অভিযোগে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। আদালতও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন। জনগণের করের টাকায় নির্মিত একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।’
এ বিষয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটির সদস্য রেজিস্ট্রার জুনায়েদ কবির বলেন, ‘ওনার (আবদুল গফুর) বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত চলছে। আমি যেহেতু কমিটির একজন সদস্য তাই আমার পক্ষে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য দেওয়াটা ঠিক হবেনা।’ দ্রুততম সময়ে তদন্তের প্রতিবেদন প্রদান করা হবে বলে জানান রেজিস্ট্রার।
অভিযোগের জবাবে মন্তব্য জানতে অভিযুক্ত প্রকল্প পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আবদুল গফুরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আবদুল গফুর দীর্ঘদিন ধরে রাবিপ্রবির অবকাঠামো নির্মাণ, দরপত্র প্রক্রিয়া, বিল-ভাউচার ও প্রকল্প ব্যয়ে নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালনায় অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, তিনি দায়িত্ব পালনকালে সরকারি অর্থ ডাবল ক্লেইম, ভুয়া বিল-ভাউচার, অগ্রিম অর্থ উত্তোলন এবং নিয়মবহির্ভূত আর্থিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আবদুল গফুর ট্রেনিং ও মিটিংয়ের নামে ঢাকা সফরে গিয়ে কর্মচারীদের নামে অগ্রিম বিল উত্তোলন করেন এবং পরে সেই অর্থ নিজেই ব্যবহার করতেন। একই সফরে ডিএ গ্রহণের পাশাপাশি পৃথকভাবে অগ্রিম উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক গোপন নথিতে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে যাদের নামে অগ্রিম উত্তোলন করা হয়েছে, তাদের কোনো স্বাক্ষরই নেই। অভিযোগ অনুযায়ী, নিজের নামে প্রয় ১৯ লাখ ৬৮ হাজার টাকা, মার্শাল চাকমার নামে ১৪ লাখ ৭ হাজার টাকা, নিশান চাকমার নামে ১২ লাখ ৯ হাজার টাকা, আবদুল হকের নামে প্রায় ৫ লাখ টাকা এবং মনজুরুল ইসলামের নামে ১৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নেমপ্লেট ও গেইট নির্মাণকাজে অনিয়ম, প্রকৌশলীদের স্বাক্ষর ছাড়া ৩৭ লাখ টাকার বিল পরিশোধ, অতিমূল্যে আসবাবপত্র ক্রয় এবং বনায়নের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। প্রশাসনের দাবি, ফার্নিচার খাতে অতিরিক্ত বিল দেখিয়ে প্রায় ৩০ লাখ টাকা এবং বনায়নের নামে আরও ৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অভিযোগ, আবদুল গফুর প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) রিপোর্ট তৈরি ছাড়াই পাহাড় কেটে নির্মাণকাজ পরিচালনা করেন। এ ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর তার বিরুদ্ধে মামলাও করেছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, শিক্ষার্থীদের উসকানি এবং প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার অভিযোগও রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত ৭ জানুয়ারি শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ড, প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্থিরতা সৃষ্টি, আইসিটি-সংক্রান্ত অপরাধ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুন্নের অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। পরে তিনি আদালতে আবেদন করলে প্রথমে স্থিতাবস্থা দিলেও সর্বশেষ শুনানিতে আদালত তাকে বরখাস্তের আদেশ বহাল রাখেন।
বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল আলমকে অতিরিক্ত দায়িত্বে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আরও দুইজন শিক্ষককে অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।



















































